অষ্টমীর অষ্টরম্ভা

— ষষ্ঠী এখন স্মৃতিমাত্র। সপ্তমীর সূর্য গত সন্ধ্যায় বিলীন হয়েছে অস্তাচলে। মহাষ্টমীর পূণ্যপ্রাতে আমরা বুনোহাঁস সম্মিলনীর তরফ থেকে আমরা পল্লীবাসীকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম এবং হার্দিক অভিনন্দন জানাই। হাআল্লো … হাআল্লো, নাইন, এইট, সেবেন, সিক্স, ফাইব, হাআল্লো টেস্টিং হাআল্লো!

মহালয়ার মত ঘুম খোঁচানো ভোররাতে নয়, আলো ফোটার পর, চায়ে মেরি বিস্কুটটা সবে ডুবেছে, ঠিক সময়ে তুলে নিতে হবে, না হলে টাইটানিক, উঠে আসবে ঠাকুরের চালচিত্রের মতো গলা বিস্কুটের টুকরো, ওই সময় অ্যানাউন্সমেন্টটা শুরু হয়েছে। যে করছে তার আসল নাম ভুলে গেছি, পাড়ায় সবাই টাইসন বলেই ডাকে। সারাবছর দেখা যায় না ওকে, ঠিক অষ্টমীর সকালে এসে মাইক মাইক করে। এমনিতে লোক ভালো, তাই কেউ আপত্তি করে না। মাইক হাতে এসব বলার উদ্দেশ্য, আমি এসে গেছি। টাইসনদা মাইক অফ করতে জানে না। এই ঘোষণাগুলোর সময় পাশের লোকের কথাও শোনা যায়।
— অস্তাচলে না আস্তাবলে? কিসের টেস্ট করছ? উল্টো গুনছ কেন? তেরোর নামতা বললেই তো পার। পল্লিবাসী আবার কে? চারদিকে আখাম্বা ফ্ল্যাটবাড়ি … অভিনন্দন কিসের? কী মহান কাজ করেছে এরা? চাঁদা চাইতে গেলে পাঁচবার ঘুরিয়েছে।
একটু পরেই পুষ্পাঞ্জলি শুরু হবে। সেই ঘোষণাটাও শুরু হয়। এবারে উত্তেজিত গলায়
— আপনারা বিশৃঙ্খলা করবেন না, একে একে সবাই সারিবদ্ধ ভাবে মণ্ডপে প্রবেশ করে, পুষ্প সঞ্চয় করে, মন্ত্র শুনে, মন্ত্রই বলবেন। তিনবার ফুল দেওয়া হবে, কিন্তু ফুল ছুড়বেন না। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা আপনাদের পুষ্পার্ঘ্য সংগ্রহ করে নেবেন…
যাব্বাবা, কেউ তো নেই, দু’টো বাচ্চা গুলি খেলছে, কে করবে বিশৃঙ্খলা? পুরুত অবশ্য ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে কী সব করছে। এই পুরুত আগে ক্যাবলা ছিল, টিভি দেখে দেখে সেয়ানা হয়ে গেছে। গলায় উত্তরীয় ফিট করেছে। মাইক হাতে নিয়ে গণেশ থেকে কার্তিক অবধি হাঁটাহাঁটি করে, নির্দেশ দেয়। গান বাজানো বারণ কিন্তু মন্ত্রপাঠে আপত্তি নেই। গাছের গায়ে বাঁধা চোঙা থেকে জোরদার অনুস্বর, বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে বসে থাকা পল্লিবাসীদের উদ্দেশে।
দুপুরে খুব গরম, তাই সকাল সকাল কিছু লোক গাড়ি ভাড়া করে একই দিনে, এক সোয়াইপে বেহালা থেকে টালা মেরে দেওয়ার তালে থাকে প্রতিবারই। পুজোর সময়ে প্রশাসন দর্শনার্থীদের বাঁশ দিতে বাধ্য হন। অসুরযুদ্ধে শহর সেজে ওঠে ব্যারিকেডে। উর্দি বা ব্যাজধারীরা পার্ক করতে উদ্যত গাড়ি দেখলেই মসৃণ হাতের ইশারায় আরও এগিয়ে যেতে বলেন। বেহালায় একজন কাচ নামিয়ে ‘এরপর তো ক্যানিংয়ে রাখতে হবে’ বলে চলে গেলেন। এই বছর আরও বাঁশ। হাইকোর্টের নির্দেশ, কাউকে খেঁকিয়ে কিছু বলার সুযোগ নেই। বুদ্ধি করে যাঁরা খোলা প্যান্ডেল করেছেন, তাঁদের দুর্গা দেখা যাচ্ছে দূর থেকেও। গুহা, সুড়ঙ্গ, গুপ্তপথে, যন্তর মন্তর কক্ষে ভরদুপুরে আঁধার রাতের রানির হাল খারাপ। ‘ও ভাই, মা কে একবার একটু দেখতে দাও না ভাই’ – করুণ অনুরোধ সত্বেও নগরাসুর সিকিউরিটিকে টলানো গেল না। তিনি বললেন ‘মা তো আছেন আপনার অন্তরে।’ ব্যাস! ‘ওরে রামকেষ্টর নাতি এলো রে’ ইত্যাদি। এসময় ভদ্র আহারাদির জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, তাই রাস্তায় নুডলস মাখা বিরিয়ানি খেয়ে বাড়ি ফেরা ছাড়া উপায় নেই। হাতে মাইক না থাকলেও মুখোশের ভেতর দিয়ে এবছর রাগ, দুঃখ, হতাশার সাউন্ড ফিল্টার হয়ে বেরিয়ে আসছে অপ্রতিরোধ্য ডেসিবেলে। এদ্দিনে মানুষের মুখোশটা একদম খুলে গেছে।

সন্ধ্যে নামার একটু আগে একটা ছোট পুজোয়, খুব ছোট মাইকে ‘আ আ আ নন্দ ধারা বহিছে ভুবনে’ হচ্ছিল, শেষ হলে আবার লুপে বেজে উঠছিল। আগামীকাল প্রাইজ ঘোষণার দিন, কে পাবে সেই নিয়ে কথা চলছিল। যে ঠাকুর, যে সজ্জা পাবলিকই দেখতে পেল না, বিচারকরা দেখে নম্বর দিয়ে কী করবে? আরে, এমসি পার্ক মারাত্মক করেছে। ওদের প্রাইজ বাঁধা। ঠাকুরটাই কেনেনি। এটা ভেতরের খবর। প্যান্ডেলের বাইরেটা হাইকোর্টের মত করেছে। ভেতর থেকে শুধু মাইকে জজের গলা শোনা যাচ্ছে ‘প্রবেশ নিষেধ, প্রবেশ নিষেধ’। হাতুড়ি, শাঁখ, ঘণ্টা, আরও কী সবের গুমগুমে আবহসঙ্গীতও রয়েছে। উদ্বৃত্ত টাকাটা জনকল্যাণে দেওয়া হবে। শ্রেষ্ঠ কনটেম্পোরারিটা কেউ আটকাতে পারবে না।
যে সব পুজোয় পুজো নয়, মূলতঃ জমায়েত, মেলা, ব্যান্ডের গান হয়, তারা খাঁ খাঁ করছে। থম মেরে বাড়িতেই বসে আছে বেশিরভাগ মানুষ। ইচ্ছে করছে না কারুরই, তাও টিভির দিকে তাকিয়ে। খুলতেই দেখি চন্দ্রবিন্দুর উপলকে চ্যানেলে ধরেছে।
– এবারে কী মিস করছেন?
উপল বলছে ‘শ্রোতাদের, অবশ্যই। সেই, তোমার দেখা নাই তোমার দেখা নাই চিৎকারটা …।’
অনেক জায়গায় ঠাকুর তো দূর অস্ত, প্যান্ডেলটাই দেখা যাচ্ছে না। আছে যথাস্থানে, এই বিশ্বাসে পাড়ার রাস্তা গলি ঘুরে চক্কর মারতে মারতে বেদম হয়ে যাচ্ছে সবাই। আর যদি বা একটু দেখা যায়, সেখানে নিজেদের লোক ঠাকুর গার্ড করে মোবাইলে ছবি তুলছে তো তুলছেই।

একটা ব্যাপারে করোনা ডাহা ফেল করেছে। সবাই ওইটা নিয়েই থিম করবে ভেবে, নিজেরা ব্যতিক্রমী প্রমাণ করতে গিয়ে, কিছুই হয়নি তেমন। কিছু পুজোসংখ্যার প্রচ্ছদে, প্যান্ডেলে, ঠাকুরের মুখ ঢেকে রাখার ব্যাপারটা থাকলেও জমেনি। মাস্ক ব্যাপারটায় সবার চোখ সয়ে গেছে। এক জায়গায় আলোর খেলা করেছিল বোধহয়, চারপাশ থেকে ভাইরাস তেড়ে আসছে। কিন্তু মাস্ক পরা মুখের কাছে এসে মুখ থুবড়ে পড়ছে। সার্কিটে কোনও গোলমাল হওয়ায়, উল্টো ঘটছে। মনে হচ্ছে, মাস্ক থেকে করোনা বেরিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশে। পরে বেশি ধরপাকড়ের ভয়ে কিছু মানুষ তৃতীয়াতেই ত্রিনয়ন দর্শনের চেষ্টা করেছিল। এখন আর সেটা নেই, সবাই ক্লান্ত। নবমীতে হয়তো শেষ ঝাঁকটা মারবে।
উদ্যোক্তারা বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে। এদিকে আলো জ্বলেছে যথারীতি। পাল তুলেছে বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং, হাওয়া নেই যদিও। পা টেনে টেনে কিছু লোক বেরিয়েছে, ঝলমলে ফাঁকা রাস্তায় ভাসছে কার্ফুর কুয়াশা। রাতের রুটি কিনব বলে একটু বেরিয়েছিলাম। দেখি, খুব চিৎকার করছে নাছোড়বান্দা একটা বাচ্চা, সে কাছ থেকে সিংহের গোঁফ দেখতে চায়। তার মা-বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করছে বোঝানোর, এখন দেখতে নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে সোনা, আর কদিন পরেই, তখন আমরা জ়ু-তে যাব, আইসক্রিম খাব, ওখানেই সব ভালো করে দেখব।

The post অষ্টমীর অষ্টরম্ভা appeared first on BanglaLive.

Source link

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *