উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে মেরুকরণের নানা অভিযোগ

 
প্রকাশিত: 07/10/2021 at 9:58 am

জনসংখ্যার বিচারে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন আগামী বছরের শুরুতেই।

ভোটের আগে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকেই খবর আসছে, পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের ওপর সেখানে হামলা চালানো হচ্ছে এবং মারধর করে তাদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতেও বাধ্য করা হচ্ছে।খবর বিবিসির।

এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে- তারাই আবার এসব ভিডিও করে ছেড়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও- যাতে মুসলিম সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সমাজকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টদের মতে, ভোটের আগে রাজ্যে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের লক্ষ্যেই খুব পরিকল্পনা করে এই কাণ্ডগুলো ঘটানো হচ্ছে – যদিও উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতাসীন বিজেপি এই অভিযোগ মানতে নারাজ।

দিল্লির কাছে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ এলাকায় এ বছরের মার্চের মাঝামাঝি একটি হিন্দু মন্দিরে ঢুকে পানি খাওয়ার অপরাধে বারো-তেরো বছরের একটি ছেলেকে মাটিতে ফেলে নৃশংসভাবে মারধর করছিল দু‌’তিনজন যুবক।

বাচ্চা ছেলেটির নাম আসিফ, বাবার নাম হাবিব – এটা শোনার পর বেধড়ক মারের সঙ্গে চলতে থাকে অকথ্য গালিগালাজ।

মোবাইল ফোনে গোটা ঘটনাটি ভিডিও করে পরে হোয়াটসঅ্যাপে আর ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে ওই যুবকরাই।

যার হেনস্থার ভিডিও দেখে গোটা দেশ শিউড়ে উঠেছিল, সেই আসিফ পরে গণমাধ্যমকে জানায়, শুধু মুসলিম হওয়ার জন্যই তাকে সেদিন ওভাবে মার খেতে হয়েছিল।

আসিফ বলে, ‘প্রথমে মাটিতে ফেলে রড দিয়ে পেটায়, তারপর হাত-পা মুচড়ে দিয়ে লাথি মারতে থাকে আমাকে।’

বাবার সঙ্গে মিলে রাস্তার ময়লা কুড়িয়ে বাঁচা ছেলেটি ভয়ে কাঁপাতে কাঁপতে আরও বলেছিল, হিন্দুরা তাদের বাড়িতে এলে সে নিশ্চয় জল খাওয়াবে- কিন্তু কোনওদিন আর ভুলেও কোনও মন্দিরে জল খেতে ঢুকবে না।

এর বর্বতার তিন মাস পরেই গাজিয়াবাদের কাছে লোনিতে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ আবদুস সামাদকে একটি নির্জন জায়গায় টেনে নিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড মারধর করা হয়।

জোর করে তাকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হয়, কাঁচি দিয়ে কেটে দেওয়া হয় লম্বা দাড়ি – আর এখানেও ভিডিও ধারণ করা হয় গোটা ঘটনাটির।

প্রবীণ মানুষটি কাঁদতে কাঁদতে পরে জানিয়েছিলেন, ক্যানালের ধার থেকে আমাকে একটি অটোতে করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ওই হামলাকারীরা।

একটু দূরে ছেড়ে দেবে বলে নিয়ে যায় একটা জঙ্গলে, তারপর একটা ঘরে আটকে রেখে বেধড়ক মার মারতে শুরু করে দেয়।

ওরা শুধু আমাকে শ্রীরাম শ্রীরামই বলায়নি, বারবার বলছিল, করবি আর পাকিস্তানের দালালি?

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মুজফফরনগর ও শামলিতে আট বছর আগের দাঙ্গায় শত শত মুসলিম ঘরছাড়া হয়েছিলেন, সেখানেও আবার ফিরে এসেছে সেই দু:স্বপ্নের স্মৃতি।

‘মকতুব’ নামে একটি এনজিওর হয়ে সেখানে দাঙ্গাপীড়িতদের মধ্যে বহুদিন ধরে কাজ করছেন রাবিহা আবদুর রহিম।

তিনি সাংবাদিকদের জানান, মুসলিম ছেলেদের মারধর করে বা মেয়েদের হেনস্তা করে তার ভিডিও তুলে রাখার ঘটনা সেখানে হরহামেশাই ঘটছে।

শুধু তাই নয়, ওই এলাকার গ্রামে গ্রামে হিন্দু নেতারা বড় বড় জমায়েত বা মহাপঞ্চায়েত ডেকে সেই সব নির্যাতন উদযাপন করছেন, মুসলিমদের প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

রাবিহার কথায়, মুসলিমদের লিঞ্চিং উপেক্ষা করা বা চুপচাপ বরদাস্ত করা এক জিনিস – কিন্তু হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে মুসলিমদের হত্যাকে সমর্থন করছে, উৎসব করছে – ভাবা যায়? এতো গণহত্যার প্রথম ধাপ!

আজকের ভারতে, উত্তরপ্রদেশে বা হরিয়ানায় কিন্তু ঠিক সেই জিনিসই হচ্ছে।আজ এদেশে মুসলিম মেয়েরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে তাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই … যে কোনও দিন তারা খুন হতে পারে, ক্যামেরার সামনে ধর্ষিতা হতে পারে বা জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারে – স্রেফ তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য।

এই জুলাই মাসের শুরুতেই উত্তরপ্রদেশের নয়ডাতে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা লোকজন মেরে অজ্ঞান করে রাস্তায় ফেলে দিয়েছিল প্রবীণ কাজিম আহমেদকেও।

লম্বা দাড়ি আর ফেজ টুপি থেকে তাঁকে খুব সহজেই চেনা যায় মুসলিম বলে – আর সে জন্যই তাকে নিশানা করেছিল হামলাকারীরা।

কোনওক্রমে প্রাণে বেঁচে ফেরা আহমেদ পরে বলেন, আলিগড়ের বাসের জন্য যখন অপেক্ষা করছিলাম – তখন ওই গাড়িটি এগিয়ে এসে আমায় লিফট দিতে চায়।

কিন্তু আমাকে গাড়িতে তুলেই যখন ওরা জানালার কালো কাঁচ নামিয়ে দেয়, তখনই আমি প্রমাদ গুনি।নামিয়ে দেওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করলেও তাতে ওরা কান দেয়নি, আমার দাড়ি টেনে ধরে একধারসে কিল-চড়-ঘুষি মারতে থাকে – দিতে থাকে খুব খারাপ গালাগালি!

কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথের আমলে উত্তরপ্রদেশে এই ধরনের ঘটনা এখন এতটাই ডালভাত হয়ে গেছে যে এখন মিডিয়াতেও এসব খবর ঠাঁই পায় না বললেই চলে।

ভারতের সবচেয়ে জনবহুল ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই রাজ্যটিতে বিধানসভা ভোট মাত্র ছয়-সাত মাস পরেই।

তার ঠিক আগে সেই রাজ্যে মুসলিম নির্যাতন যেন একটা নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী চলছে, একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করছে বলে গণমাধ্যমকে বলছিলেন আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্রনেত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট আফরিন ফতিমা।

আফরিন ফতিমা বলছিলেন, এ রাজ্যে মুসলিমদের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে – আর পুরোটাই করা হচ্ছে পরিকল্পিত ছকে।

গবেষণা বলে, যে কোনো দাঙ্গার পরেই মুসলিমরা কিন্তু মিশ্র বসতির এলাকা ছেড়ে গিয়ে নিজেদের ঘেটোতে গিয়ে বাস করতে চায়। এখানেও ভোটের আগে ভয় দেখিয়ে ঠিক সেভাবেই মুসলিমদের কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে।

রুটিরুজির প্রয়োজনে তাদেরও বাইরে বেরোতেই হয় – কিন্তু উত্তরপ্রদেশে প্রতিটি মুসলিম নারী-পুরুষ জানেন প্রতিদিন বাড়ির বাইরে পা ফেলেই তারা বিরাট একটা ঝুঁকি নিচ্ছেন!

কিন্তু এই যে ধারাবাহিকভাবে রাজ্যের একটি সম্প্রদায়ের মানুষজন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, পুলিশ-প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদত ছাড়া এটা কি আদৌ সম্ভব হত?

রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির মুখপাত্র সাক্ষী দিবাকর কিন্তু বলেন, আমাদের সরকার সবার পাশে আছে, সবার উন্নয়নের জন্য কাজ করছে – ধর্মের ভিত্তিতে কোনও বিভেদ করার প্রশ্নই ওঠে না।

তবে বিষয়টাকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন ভারতের সবচেয়ে দক্ষ, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন, বিক্রম সিং।

দীর্ঘদিন উত্তরপ্রদেশ পুলিশের মহাপরিচালক পদে থাকা ড. সিং বলেছেন, যে কোনও সভ্য সমাজে এরকম মেরুকরণের চেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও হতাশার – এগুলো কখনওই হওয়া উচিত নয়।

উত্তরপ্রদেশে বহু শতাব্দী ধরে হিন্দু ও মুসলিমরা যেমন শান্তিতে পাশাপাশি থেকেছে, তেমনি এখানে নানা ডিসটার্বিং ফল্টলাইনও আছে।

তবু আমি পুলিশের ওপর ভরসা হারাতে রাজি নই, রাজ্য পুলিশের নতুন ডিজি মুকুল গোয়েল আমার নিজের হাতে-গড়া অফিসার – তার চাপের কাছে মাথা না-নোয়ানোর ক্ষমতা ও সততায় আমার পূর্ণ আস্থা আছে।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার উত্তরপ্রদেশ পুলিশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুলিশ বাহিনী – ডিজির নির্দেশ সব সময় ঠিকমতো নিচুতলায় পৌঁছয় না।

এই ধরনের একটি ঘটনা ঘটলেও তা সমূলে নির্মূল করতে হবে … এবং আমার ধারণা ‘জিরো টলারেন্সে’র বার্তাটা নড়বড়ে হয়ে গেছে বলেই এরকম বিভেদের বীজ মাথাচাড়া দিচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন । আজই পাঠিয়ে দিন - write@sarabangla.in