জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি নিয়ে কম বই বাংলায় লেখা হয়নি৷ কিন্তু সে বাড়ির, বিশেষ করে ছয় নম্বর বাড়ির ভৌতিক দিক নিয়ে কানাঘুষোয় কিছু গল্প শোনা গেলেও তথ্য সম্বলিত কোনো লেখা চোখে পড়ে না৷ সম্ভবত বাংলার রেনেসাঁসের ভরকেন্দ্র এই ভবনটির ঐতিহ্যে কেউ কোনওরকম ছায়া ফেলতে চান না৷ ঠাকুর পরিবারের একজন সদস্য কিন্তু এই অলিখিত নিষেধাজ্ঞার বেড়া ভেঙে কিছু অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন৷ তিনি রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের পৌত্রবধূ অমিতা ঠাকুর৷ কবির বিশেষ অন্তরঙ্গ অজিতকুমার চক্রবর্তীর কন্যা৷ এক সময়ে ‘তপতী’ নাটকে কবি নিজে রাজা বিক্রমের ভূমিকায় অভিনয় করতেন, রানির অভিনয়ে থাকতেন তরুণী অমিতা৷ কবির পাশে অমিতার অভিনয় রীতিমত সাড়া ফেলেছিল৷ রবীন্দ্রনাথ যেজন্য নাতবৌকে ঠাট্টা করে ‘মহিষী’ বলে ডাকতেন৷ অবনীন্দ্রনাথ লিখছেন— “অমিতা তপতী সেজে অগ্নিতে প্রবেশ করছে, সে এক অদ্ভুত রূপ৷ প্রাণের ভেতরে গিয়ে নাড়া দেয়।”

অমিতা ঠাকুরবাড়িতে বউ হয়ে আসার পরে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতা কিন্তু ততটা মধুর হয়নি৷ অমিতা ঠাকুর লিখছেন— “তখন আমার বয়স খুবই অল্প— সবে ষোল বছর পূর্ণ হয়েছে৷ কয়েকমাস হলো আমার ছেলে জন্মেছে৷ সেটা ছিল ফাল্গুন-চৈত্র মাস, যাকে বলে বসন্তকাল৷ আমাদের দক্ষিণ খোলা মহলটা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়৷ পশ্চিমদিকে তেতলার খোলা ছাদ, যে তেতলার ছাদ ঐতিহাসিক গুরুত্ব পেয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্য দিয়ে৷ ওইখানেই কি না তাঁর নতুন বৌঠান বাগান করেছিলেন৷ ওই ছাদ আমাদের তেতলার ঘরের সংলগ্ন ছিল৷ আমাদের ঘর থেকে যেতে গেলে প্রথমে দুই ধাপ সিঁড়ি তার পর বেশ কয়েকধাপ কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তবে ওই ছাদ৷ ছাদে আমার স্বামী (রবীন্দ্রনাথের বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের পৌত্র অজীন্দ্রনাথ), আমার দেওর (স্বরীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথের আর এক নাতি) ও ওঁদের এক বন্ধু মাদুর পেতে শুয়েছেন৷ ঘরে আমি একাই বাচ্চাকে নিয়ে, আর ওর দাসী, নাম তার শান্তি, সে আমার ঘরের সংলগ্ন ছোট ছাদে শুয়ে৷

রাত তখন বারোটা৷ আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে, কিছুতেই ঘুম আসছে না৷ বাচ্চাটাও খুঁতখুঁত করছে দেখে আমি একটু সুগার অফ মিল্ক গুলে বোতলে করে সিঁড়ির দিকে পিছন ফিরে শুয়ে খাওয়াচ্ছি৷ এমন সময় শুনি পিছনে সিঁড়ি দিয়ে কে নামছে৷ সে খুব লম্বা চওড়া ভারী লোক৷ পায়ের আওয়াজ থেকে এইরকমই মনে হয়েছিল৷ আমি তো একেবারে নিশ্চিন্ত যে আমার স্বামীই আসছেন জল-টল খেতে, নয়তো বাথরুম যেতে৷ তাই আমি আর তাকাইনি পিছন ফিরে কিন্তু মনে মনে ভাবছি ফিরে যাবার সময় বলবো আমার কেমন জানি লাগছে, ঘুমও আসছে না৷ কিন্তু ফিরে যাবার আর কোনো আওয়াজ নেই৷ তখন আমি ভাবলাম পাশের ঘরে যখন ঢুকেছেন তখন নিশ্চয়ই ওখান দিয়ে বেরিয়ে নীচে চলে গেছেন ভিতরের সিঁড়ি দিয়ে৷ উঠে ওঘরে গিয়ে দেখি— ও-মা— আগাগোড়া সব শার্শিই বন্ধ, বেরোতে গেলে তো না-খুলে উপায় নেই৷ তখন ভাবলাম হয়তে আমাকে ভয় দেখাবার জন্য ফেরবার সময় পা-টিপে টিপে গেছেন, তাই টের পাইনি৷ আমার তখন ভীষণ রাগ হলো৷ যাও-বা ঘুমোতাম, রাগের চোটে ঘুমেরও বারোটা বেজে গেল৷

একটু পরে দেখি উনি এসে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন – তুমি কি ছাদে গিয়েছিলে একটু আগে ?
বার বারই জিজ্ঞেস করলেন কিন্তু আমি তো রেগেই ছিলুম, আরো রেগে গেলুম, উত্তর দিলুম না৷
এখন হয়েছে কি, ওঁদের যে বন্ধুটি শুয়েছিলেন ছাদে, তিনি একটা পায়ের আওয়াজ পেয়ে ভেবেছেন আমি বোধহয় ভয় পেয়ে ছাদে গিয়ে থাকবো তাই ওঁকে ঠেলে তুলে পাঠিয়েছিলেন জানতে৷ পরের দিন সকালে সেকথা জানতে পেরে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম৷”

এর পরেও অনেক রাতেই অমিতা ঠাকুর শুনতে পেতেন ভারী ভারী পা ফেলে কেউ যেন সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করছে৷ কিন্তু তিনি সেই শব্দ শুনলে এত ভয় পেতেন যে, কোনওদিন চোখ খুলে দেখার চেষ্টা করেননি শব্দের উৎস কী হতে পারে৷ অনেকদিন পরে দিনেন্দ্রনাথের স্ত্রী কমলাবৌঠানের কাছে জানতে পেরেছিলেন যে, সেই রকম পদশব্দ ওবাড়ীর অনেকেই শুনতে পেয়েছে কিন্তু মানুষটিকে কেউ কখনও দেখতে পায়নি৷ তাঁদের ধারণা ছিল, যিনি আসতেন তিনি দ্বিজেন্দ্রনাথের সেজো ছেলে নীতীন্দ্রনাথ৷ মহর্ষির প্রিয়তম নাতি নীতিন্দ্রনাথ ছিলেন বাড়ীর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা-চওড়া পুরুষ৷ জোড়াসাঁকোর লালবাড়ি তাঁরই তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছিল৷ প্রতি বছর মাঘোৎসবের আলোকসজ্জার দায়িত্বও তাঁরই থাকতো৷ হয়তো অল্প বয়সে মৃত্যু তাঁর বাড়ীর প্রতি আকর্ষণ আরও তীব্র করে তুলেছিল, তাই প্রতি রাত্রে ফিরে ফিরে আসতেন দেখতে সব ঠিকঠাক আছে কি না৷

ওই বাড়ীতেই দ্বিজেন্দ্রনাথের মাসতুতো ভাইয়ের মেয়ে সরলার স্বচক্ষে ভূত দেখার অভিজ্ঞতাও বেশ রোমহর্ষক৷ সরলার স্বামী তখন অসুস্থ, বাড়ীর দোতলার মহল খালি ছিল, সেইখানে তাঁরা থাকেন৷ ওই ঘরে এক সময়ে সুশোভিনী দেবী থাকতেন, ঘরটি তাঁর স্বামী দ্বিজেন্দ্রনাথের বড় ছেলে অরুণেন্দ্রনাথের ঘর ছিল৷ কিন্তু স্ত্রী ওই ঘরে মারা যাবার পরে অরুণেন্দ্র অন্য ঘরে চলে যান৷ সরলার স্বামীর তখন অসুখের খুব বাড়াবাড়ি চলছে, তিনি স্বামীর পাশে রাত জেগে বসে আছেন৷ হঠাৎ দেখতে পেলেন, ভেতরের উঠোনের অন্য প্রান্তে একজন অপরিচিত স্ত্রীলোক তাঁদের দিকে চেয়ে আছেন একদৃষ্টে৷ দৃষ্টিটা কেমন যেন অস্বাভাবিক রকমের স্থির৷ কিছুক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ওইভাবে তাকিয়ে থাকার পরে তাঁকে আর দেখা গেল না৷ পরের দিন সকালে ঘটনাটা শুনে এবং যাঁকে দেখেছিলেন, তাঁর চেহারা বর্ণনা জানবার পরে প্রফুল্লময়ী দেবী (রবীন্দ্রনাথের ন-বৌঠান) বলেছিলেন যাঁকে সরলা দেখেছিলেন তিনি সম্ভবতঃ সুশোভিনী দেবীই ছিলেন৷ এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই সরলার স্বামীর মৃত্যু হয়৷

অবনীন্দ্রনাথের স্ত্রী সুহাসিনী দেবী জানিয়েছেন— “যখন লোকাভাবে ছনম্বর বাড়ীর তিনতলা পুরো তালাবন্ধ থাকতো, তখনও ছাদে নানারকম আওয়াজ, এমনকি ঘরে আলো জ্বলতেও দেখা যেতো৷ শূন্য বাথরুমে জল পড়ে যাওয়ার শব্দ, ফিশফিশ করে নানারকম গলায় কথা শুনতে পাওয়া তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল৷’’
এত তো হলো ছয় নম্বর বাড়ীর গল্প৷ পাঁচ নম্বর বাড়ি, যেখানে দ্বারকানাথের ছয়নম্বর বাড়ীর বাসিন্দারা ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরে দেবেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় ভ্রাতা গণেন্দ্রনাথ বংশের গৃহদেবতা শালগ্রামশিলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেবাড়িও ভূতের ছোঁয়াচ থেকে রক্ষা পায়নি৷ পাঁচ নম্বর বাড়ির অন্যতম জ্যোতিষ্ক অবনীন্দ্রনাথ৷ একাধারে ছবির রাজা, শিশুসাহিত্যিক, কাটুম-কুটুমের শিল্পী, অবন ঠাকুরের ঝুলিতে বেশ কিছু ভুতের সঙ্গে মুখোমুখির গল্প আছে৷ তিনি স্মৃতিচারণ করছেন— “একবার আমি লিভারের ব্যথায় খুব কাতর হয়ে কষ্ট পাচ্ছি, কড়া ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমোতে পারছি না, সেই সময়ে এক নিশুতি রাতে সকলে যখন সুষুপ্ত, আমি ব্যথায় কাতর হয়ে খোলা চোখে তাকিয়ে আছি, হঠাৎ মনে হল বিছানার মশারি আর ঘরের দেওয়াল কাঁপতে কাঁপতে সরে যাচ্ছে, আর আমার স্বর্গতা মার হাতখানি মশারির ওপর থেকে নেমে আসছে৷
মনে হল মা আমাকে জিজ্ঞেস করছেন – কোথায় ব্যথা ? এইখানে ?

তারপরে হাতটি নেমে ঠিক যেখানে ব্যথা সেখানটি স্পর্শ করলো৷ একমুহূর্তে আমার সমস্ত শরীর যেন শীতল হয়ে গেল৷’’ অবনীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করলেন তাঁর শরীরে কোথাও কোনও ব্যথা নেই, মা-র হাতও অদৃশ্য হয়েছে৷ সে ব্যথা আর কোনদিন ফিরে আসেনি৷ বলা বাহুল্য ডাক্তাররা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ব্যাথার ভৌতিক সমাধান জানতে পেরে৷

Comments

comments