তালিকায় আছে বাস্তবে নেই

 
প্রকাশিত: 07/25/2021 at 7:42 am

দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভয়াবহ সংক্রমণে করোনা মহামারি প্রকট রূপ ধারণ করেছে। আক্রান্ত রোগীর বড় অংশই ফুসফুসে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। যাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিতে আইসিইউর (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) প্রয়োজন হয়। ইতোমধ্যে দেশের পূর্ণাঙ্গ (৬৬০টি) আইসিইউ শয্যা কোভিড রোগীতে পূর্ণ। এমনকি জোড়াতালি দেওয়া নামমাত্র আইসিইউগুলোর শয্যাও আর ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সরকারিভাবে বলা হচ্ছে-তালিকাভুক্ত ১৩২১ শয্যার মধ্যে ১০৭৬টিতে রোগী রয়েছে। সেদিক থেকে পূর্ণাঙ্গ ও অসম্পূর্ণ মিলিয়ে আইসিইউ শয্যার ৮০ শতাংশই রোগীতে পূর্ণ। এ ধরনের শয্যার হিসাব নিয়েও গোলমাল আছে। এখনো তৈরি হয়নি; কিন্তু ঘোষণা দেওয়া হয়েছে আইসিইউ বেড। এভাবে সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নেই। এ পরিস্থিতিকে চিকিৎসকরা বলছেন, সরকারিভাবে কোভিড আইসিইউর তালিকা কাজির গরুর মতো। তালিকায় আছে বাস্তবে নেই।

সরকারের তালিকায় সারা দেশে ১৩২১টি কোভিড আইসিইউ সমমানের শয্যা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ফাঁকা আছে ২৪৫টি। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগে শয্যা দেখানো হয়েছে ১২৫৯টি এবং এ মাসের শুরুতে দেখানো হয়েছিল ১১৬৫টি। এত স্বল্প সময়ে শতাধিক আইসিইউ শয্যা কীভাবে স্থাপন হলো, সে বিষয়ে খোদ চিকিৎসকদের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। রাজধানীর ১৬টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ১০টিতে এবং বেসরকারি ২৮টি হাসপাতালের ৮টিতে ফাঁকা নেই কোনো আইসিইউ শয্যা। করোনা রোগীর জন্য নির্ধারিত সাধারণ শয্যারও সংকট তৈরি হচ্ছে। রোগী বাড়লেই তীব্র হবে সাধারণ শয্যার অভাব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দেশে যে পরিমাণ আইসিইউ আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃত চিত্র সেরকম নয়। সরকারিভাবে আইসিইউ উপযোগী শয্যাগুলোকে আইসিইউ হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে স্বয়ংসম্পূর্ণ আইসিইউ আরও অনেক কম। তারা বলেন, রাজধানীর জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কোভিড আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১০টি। কিন্তু এর মধ্যে ভেন্টিলেশন সুবিধা আছে মাত্র ৪টিতে। একই অবস্থা খুলনার অন্যতম চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র শেখ আবু নাসের হাসপাতালে। সেখানে ১০ শয্যার আইসিইউর মধ্যে চারটিতে সেবা প্রদান করা হয়। সম্প্রতি রাজধানীর একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে শয্যা ফাঁকা দেখে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেখানে রোগী পাঠান; কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে কোনো আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত শয্যাও তালিকাভুক্ত হিসাবে দেখানো হয়। তারা আরও জানান, কোথাও কোথাও শয্যার সঙ্গে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা, বিপ্যাপ বা সিপ্যাপ সংযোগ থাকলেই সেটা আইসিইউ বলা হচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে আইসিইউ নয়। এসব শয্যার কতগুলোয় শুধু উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহ করা সম্ভব। কতগুলোয় নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন সুবিধা দেওয়া যাবে। অর্ধেকেরও কম পরিমাণ শয্যায় ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন সুবিধা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১৩২১টি। এর মধ্যে রাজধানীর ১৬টি সরকারি হাসপাতালে ৩৯৩টি। ২৮টি বেসরকারি হাসপাতালে ৫০৫টি। ঢাকা শহরসহ ঢাকা জেলায় মোট আইসিইউ সমমানের শয্যা আছে ৯৬১টি। চট্টগ্রাম বিভাগের সব জেলা ও উপজেলায় ১০৭টি। ময়মনসিংহ বিভাগে ২২টি, রাজশাহী বিভাগে ৫৮টি, রংপুর বিভাগে ৪৪টি, খুলনা বিভাগে ৭৪টি, বরিশাল বিভাগে ৩৩টি এবং সিলেট বিভাগে ২২টি।

এর মধ্যে সিলেটে বর্তমানে কোনো আইসিইউ শয্যা খালি নেই। বরিশালে খালি আছে ১১টি, খুলনায় ১৬টি, রংপুরে ২০টি, রাজশাহীতে ১৪টি, চট্টগ্রামে ২২টি, ময়মনসিংহে ৮টি এবং ঢাকায় ১৫৪টি।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, কোভিড চিকিৎসায় আমরা আইসিইউর প্রাধান্য দিচ্ছি না। যে শয্যা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। রোগী বাড়লে সংকট সৃষ্টি হবে। চাইলেই আইসিইউ করা যায় না, অনেক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত নার্স, চিকিৎসক প্রয়োজন। তাই যেসব স্থানে আইসিইউ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না, সেসব স্থানে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার ব্যবস্থা করতে হবে। জেলা-উপজেলায় সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দ্রুত সব জেলায় আইসিইউ করতে অবশ্যই সেটি করতে হবে। আইসিইউর যেসব ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো দ্রুত পূরণ করতে হবে। ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। একটি শয্যাও যেন অব্যবহৃত না থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা জানান, একজন মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় অবশ্যই কার্যকর আইসিইউ প্রয়োজন। আইসিইউ শুধু একটি শয্যা নয়, রোগীর চিকিৎসায় এর সঙ্গে আরও অনেক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। কিন্তু বেশির ভাগ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অনেক আইসিইউতে নেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভেন্টিলেটর সুবিধা। অনেক আইসিইউতে নেই সিরিঞ্জ পাম্প, এবিজি মেশিন বা ডিফেব্রিলেটর। ফলে রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হলেও তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিদের্শনা মতে, একটি আদর্শ আইসিইউর জন্য বেশকিছু জিনিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেমন-আইসিইউ শয্যা, আইসিইউ ভেন্টিলেটর, ইনফিউশন পাম্প বা সিরিঞ্জ পাম্প, নেবুলাইজার মেশিন, পেশেন্ট মনিটর, পালস অক্সিমিটার, সাকশন মেশিন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ১৩২১টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ভেন্টিলেটর মেশিন রয়েছে ৬৬০টি। অর্থাৎ, অর্ধেক শয্যায় এ গুরুত্বপূর্ণ মেশিনটি নেই। ২৯৮টি ভেন্টিলেটর মেশিন কোভিড শুরুর আগেই ছিল। দেশে কোভিড-১৯ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১০০টি ভেন্টিলেটর দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের (এইচএসএম) পক্ষ থেকে ১০০টি কেনা হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কেনা হয় আরও ১৪৪টি এবং ইউনিসেফের পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে ১৮টি। অর্থাৎ কোভিডকালীন আইসিইউ শয্যা বাড়ানো হলেও সেগুলোকে পরিপূর্ণ রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া অনেক বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউতে নামমাত্রই সুবিধা দেওয়া হয়। বেসরকারি পর্যায়ের অনেক হাসপাতালে শুধু শয্যা ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন । আজই পাঠিয়ে দিন - write@sarabangla.in