বছরের সেরা দশক জিলহজের প্রথম দশ দিন

 
প্রকাশিত: 07/11/2021 at 11:11 am

দুনিয়ার পরিবর্তে আখেরাত, পাপের পরিবর্তে পূণ্য ও মানুষের সন্তুষ্টির পরিবর্তে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে আমৃত্যু ইবাদত করলে অবশ্যই ইহকালে তৃপ্তি ও পরকালে মুক্তি অনিবার্য নিশ্চিত।

আল্লাহতায়ালা মহান দয়ালু ও মহা-অনুকম্পাশীল। তার মতো দয়ার্দ্র ও ক্ষমাকারী আর কেউ হতে পারে না। তিনি তার হুকুম পালনকারী ও অনুগতদের জন্য সৃষ্টি করেছেন চিরস্থায়ী সুখনিবাস জান্নাত। যাতে তারা পরকালীন অনন্ত জীবনে পরম শান্তিতে বসবাস করতে পারে।

কিন্তু মানুষ প্রবৃত্তির অনুসারী; নিজের অজান্তে কিংবা শয়তানের প্ররোচনায় অসংখ্য গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। আর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলগুলোই সুখময় জান্নাতের সম্মুখে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু মহান আল্লাহ ক্ষমা করতেই ভালোবাসেন। তাই গুনাহগার বান্দারা যেন হতাশ না হয়, সেজন্য ক্ষমার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘হে আমার ইমানদার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। তিনি তো অতি ক্ষমাশীল, বড় দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৩৯)

যারা ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন, তাদের ভুল শোধরানোর জন্য আল্লাহতায়ালা কিছু বিশেষ সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন। যাতে সে সময়গুলোতে বান্দা বেশি বেশি ইবাদত করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে; নিজেদের পাপ ও গুনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারে।

এমনই এক বিশেষ সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। এই দিনগুলোকে রাসুল (সা.) বছরের শ্রেষ্ঠ দিন বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সেরা দশক

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এমন কোনো দিন নেই, যার আমল জিলহজ থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! (সা.) আল্লাহর পথে সংগ্রাম-জিহাদও নয়? জবাবে রাসুল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধে বের হলো এবং এর কোনো কিছু নিয়েই ফিরে না এলো, (অর্থাৎ যে শাহাদাত বরণ করেছেন) তার কথা ভিন্ন।’ (বুখারি, হাদিস : ৯৬৯)

অপর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দশকের দিনগুলো। অর্থাৎ জিলহজের প্রথম দশ দিন। জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর পথে জিহাদেও কি এরচেয়ে উত্তম দিন নেই? রাসুল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদেও এরচেয়ে উত্তম দিন নেই। তবে হ্যাঁ, কেবল সে-ই যে (জিহাদে) তার চেহারাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।’ (মুসনাদে আবি ই’য়ালা, হাদিস : ২০৯০)

প্রথমত আল্লাহতায়ালার কাছে প্রত্যেকটা দিনই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তিনিই তো এই দিন-রাতের স্রষ্টা। দিন-রাত প্রত্যেকটিকেই তিনি অনন্য গুণে গুণান্বিত করেছেন। তবে এই দিনগুলোতে যেহেতু সবগুলো মৌলিক ইবাদতের সমাবেশ ঘটে, সেহেতু এ দিনগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য দিনের চেয়ে অধিক হওয়াই যুক্তিসংগত।

যেমনটা প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) তার বুখারি শরিফের ব্যখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারিতে উল্লেখ করেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘জিলহজের দশকের বৈশিষ্ট্য ও কারণ যা প্রতীয়মান হয়, তা হলো এতে সব মৌলিক ইবাদতের সন্নিবেশ ঘটে। যেমন- সালাত, সিয়াম, সদকা, হজ ইত্যাদি। অন্য কোনো দিন এতগুলো ইবাদতের সমাবেশ ঘটে না। (ফাতহুল বারি : ২/৪৬০)

রোজার সওয়াব

এই গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো আমাদের জন্য অতীব জরুরি। জাগতিক পরীক্ষার দিনগুলোতে যদি সবচেয়ে ভালো ফলাফল অর্জন করার লক্ষ্যে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে পারি; তবে কেন আখেরাতের পরীক্ষার জন্য এমন মাহাত্ম্যপূর্ণ দিনগুলোতে সর্বাধিক প্রচেষ্টা করতে পারব না?

এ দিনগুলোতে আমল করার সওয়াব তো বছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিলহজের দশ দিনের ইবাদত আল্লাহর কাছে অন্যান্য দিনের ইবাদতের তুলনায় বেশি প্রিয়। এ মাসের প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছরের রোজার মতো, আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের মতো।’ (তিরমিজি শরিফ, হাদিস : ৭৫৮)

আসুন! মাহাত্ম্যপূর্ণ এই দিনগুলোতে কী কী নেক আমল করা প্রয়োজন তা জেনে নিই

নফল ইবাদত

জিলহজ মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকে দশ তারিখ পর্যন্ত যতদিন সম্ভব নফল রোজা রাখা আর রাতের বেলা বেশি বেশি ইবাদত করা একজন সত্যিকার মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তাই এই দিনগুলোতে নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, তাসবিহ-তাহলিল, তাওবা-ইস্তিগফার ও ক্ষমা-প্রার্থনা এবং কান্নাকাটির মাধ্যমে রাত কাটানো কিংবা যতটুকু সম্ভব ইবাদত করা উচিত। পুরো নয়দিন রোজা না রাখতে পারলেও আরাফার দিনে রোজা রাখা খুবই উত্তম।

আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, এ রোজা তার আগের ও পরের বছরের গুনাহ মুছে ফেলবে।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৭৪০)

আরাফার দিনের আরেকটি আমল হলো- নিম্নোক্ত কালিমাটি বেশি বেশি পড়া। কালিমাটি হলো- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু বিয়াদিহিল খাইরু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদির।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬৯২২)

তাকবিরে তাশরিক

জিলহজ মাসের নবম তারিখের ফজর থেকে তের তারিখের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বুদ্ধিমান মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। উল্লেখ্য, পুরুষের জন্য শব্দ করে আর নারীদের জন্য নীরবে।

তাকবিরে তাশরিকটি হচ্ছে- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ৬০৭১)

কোরবানি

জিলহজের প্রথম দশকের অন্যতম আরেকটি দিবস হলো কোরবানির দিন। হাদিসে এসেছে ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো, কোরবানির দিন, অতঃপর স্থিরতার দিন (কোরবানির পরের দিন)।’ (সুনানে নাসায়ী : ১০৫১২)

এদিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো ঈদের নামাজ শেষে কোরবানি করা। যারা কোরবানি দেবেন তাদের জন্য আরেকটি আমল হলো, জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে হাত-পায়ের নখ, মাথার চুল ও অবাঞ্ছিত পশম ইত্যাদি কাটা বা ছাঁটা থেকে বিরত থাকা এবং কোরবানির দিন তা কাটা বা পরিষ্কার করা। কেননা এ কাজটি সুন্নাত।

হযরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন- ‘যখন (জিলহজের প্রথম) ১০দিনের সূচনা হয়, আর তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছে করে, সে যেন চুল-নখ ইত্যাদি না কাটে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১৪৯)

তবে খেয়াল রাখতে হবে হাত-পায়ের নখ, মাথার চুল ও অবাঞ্ছিত পশমের বয়স যেন চল্লিশ দিনের বেশি না হয়ে যায়। আর এ জন্য উত্তম হলো জিলহজের চাঁদ উদিত হওয়ার কিছুদিন আগেই তা পরিষ্কার করে ফেলা।

আল্লাহতায়ালার অশেষ মেহেরবানি যে, তিনি আমাদের মতো পাপী-তাপী বান্দাদের জন্য স্বীয় অনুগ্রহে এমন সব নেক আমল করার সুযোগ দিয়েছেন। তাই এই সুযোগের সদ্বব্যহার করা অত্যন্ত জরুরি।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন । আজই পাঠিয়ে দিন - write@sarabangla.in