বন্ধ দোকানপাট যানবাহন, আড্ডা পাড়া-মহল্লায়

 
প্রকাশিত: 07/24/2021 at 11:25 am

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি শেষে শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে সারা দেশে পূর্বঘোষিত কঠোর লকডাউন (বিধিনিষেধ) শুরু হয়েছে। মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিন শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ও যানবাহন বন্ধ ছিল। তবে পাড়া-মহল্লায় আড্ডাবাজি চলেছে।

বিকালের দিকে অলিগলির চটপটি ও ফুসকাসহ নানারকম মুখরোচক খাবারের স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকানে নগরবাসীকে ভিড় করতে দেখা গেছে। রাস্তায় বের হওয়া অধিকাংশ মানুষের মুখেই মাস্ক ছিল না। বিধিনিষেধ কার্যকর করতে এদিন পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্য সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি চালাতে দেখা যায়। চেকপোস্ট বসিয়ে তারা তল্লাশি চালায়।

বিধিনিষেধ অমান্য করায় এদিন ঢাকায় ৪০৩ জনকে গ্রেফতার এবং ২০৩ জনকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২৭০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ৪৪১টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহণ একেবারে ছিল না। তবে রিকশা চলতে দেখা গেছে। অল্প কিছু মানুষকে জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় দেখা গেছে। ওষুধ অথবা নিত্যপণ্য কিনতে কেউ কেউ ঘর থেকে বের হন। আবার কেউ কেউ হেঁটে গন্তব্যে যান।

তবে অলিগলির চিত্র ছিল ভিন্ন। মহল্লায় চায়ের দোকান খোলা রাখা হয়। এসব দোকানে রীতিমতো আড্ডায় মেতেছে মানুষ। বিশেষ করে গলির মোড়ে মোড়ে ছিল তরুণদের আড্ডাবাজি। তাদের অনেকের মুখে মাস্ক ছিল না।

ঢাকার প্রবেশপথ আমিনবাজার ব্রিজে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এ কারণে দূরপাল্লার যাত্রীদের আমিনবাজারে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় হেঁটে, রিকশা ও ভ্যানে রাজধানীতে প্রবেশ করে যাত্রীরা। গন্তব্যে পৌঁছতে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রিকশা ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেকে হেঁটে গন্তব্যে যান।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী করম আলী জানান, বগুড়া সদর থেকে তিনি ফিরেছেন। গাবতলী হয়ে পুরান ঢাকার বংশালে যাবেন তিনি। ৫০০ টাকায় রিকশা ঠিক করেছেন তিনি। রিকশাচালক কামালের দাবি, ভাড়া কম হয়ে গেছে। তার কথা শুনে পাশের আরেক রিকশাচালক বলেন, আজকের জন্য এটা অনেক কম ভাড়া।

নড়াইলের কালিয়ার যুবক বিপ্লব ফকিরের সৌদি আরব যাওয়ার ফ্লাইট শনিবার। কলাবাগানের একটি হাসপাতালে তার করোনা পরীক্ষা করার কথা রয়েছে। সাভারের আমিনবাজারে আসার পর বাস থেকে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর হেঁটে গাবতলী পর্যন্ত এসেছেন। কলাবাগানে যাওয়ার জন্য সাড়ে ৩০০ টাকা রিকশা ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। তাই কলাবাগানে তিনি হেঁটে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিয়েছেন।

কঠোর বিধিনিষেধের প্রথমদিনে নগরীর মহাখালী, তেজগাঁও, ফার্মগেট, শেরেবাংলা নগর, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-সড়কে যানবাহনের কোনো চাপ নেই। তবে গাবতলীতে দূরপাল্লার গাড়ি প্রবেশ করায় সেখানে গাড়ির চাপ লক্ষ করা গেছে।

যানজটসহ নানা কারণে দূরপাল্লার বাসগুলো ঢাকায় ফিরতে দেরি হওয়ায় চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো গণপরিবহণ ঢাকার বাইরে যেতে পারছে না। কল্যাণপুরের টেকনিক্যাল মোড় ও গাবতলী টার্মিনালে চেকপোস্টে কড়াকড়ি অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিকের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশনার বাইরে কোনো যানবাহনকে রাস্তায় চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমরা কঠোর অবস্থানে থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছি। মিরপুর এলাকার মোড়ে মোড়ে চেকপোস্টে পরিবহণের গতি রোধ করা হয়। সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রমাণ দিতে না পারলে সেগুলো ফেরত পাঠানো হয়।

সকালের দিকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঢাকামুখী মানুষের সে াত দেখা গেলেও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় তেমন কাউকে দেখা যায়নি। বাসগুলো টার্মিনালে সারি সারি করে রাখা হয়েছে। একটি পরিবহণের সহকারী কামাল বলেন, ভোরবেলায় গাড়ি পার্কিং করা হয়েছে। ভোরের দিকে মানুষজনের চলাচল শেষ হয়ে গেছে। আগামী ১৪ দিন গাড়ি বন্ধ থাকবে।

সড়কে পর্যাপ্তসংখ্যক চেকপোস্ট এবং অসংখ্য পুলিশ সদস্য ও একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখা গেছে। তবে তাদের তৎপরতা চোখে পড়েনি। আড়াআড়িভাবে বাঁশ ফেলে অনেক এলাকার রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। মতিঝিলের ইত্তেফাক মোড়ের চেকপোস্টে সদস্যদের বেশ তৎপর দেখা যায়। অকারণে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছেন-এমন দুজনকে জেরা করতে দেখা যায়। তাদের মুখে মাস্ক ছিল না। হেলমেটও ছিল না। মতিঝিল থেকে পল্টন, কাকরাইল ও সেগুনবাগিচা সড়ক জনশূন্য ছিল। এসব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতিও ছিল কম।

প্রথমদিনে রাজধানীতে চার শতাধিক ব্যক্তি গ্রেফতার : বিধিনিষেধ অমান্য করায় রাজধানীতে ৪০৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০৩ জনকে ১ লাখ ২৭ হাজার ২৭০ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া ৪৪১টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) ইফতেখায়রুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যৌক্তিক কারণ ছাড়া যারাই ঘর থেকে বের হবে তাদেরই মামলার মুখোমুখি হতে হবে। যতদিন লকডাউন চলবে ততদিন পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামের সড়কে যানবাহন ও জনসমাগম খুবই কম ছিল। গণপরিবহণসহ ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলেও কিছুসংখ্যক রিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা গেছে। মূলত লকডাউনের প্রথমদিন চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট ছিল ফাঁকা। অধিকাংশ দোকানপাট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। জনগণকে বিধিনিষেধ মানাতে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ১৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের টিম সক্রিয় ছিল।

নগরীর প্রবেশদ্বার সিটি গেট, শাহ আমানত সেতু, অক্সিজেন, কাপ্তাই রাস্তারমাথা ও মইজ্যারটেক এলাকায় সেনা ও পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। বিভিন্ন এলাকায় তারা টহল দেয়। গাড়ি নিয়ে বের হয়ে অনেকে বিভিন্ন মোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশ্নের মুখে পড়েন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্টাফ অফিসার ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, মাস্ক না পরে রাস্তায় বের হওয়ায় ৩০টি মামলায় ৭ হাজার ৮৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মহানগরীজুড়ে ছিল নিস্তব্ধতা। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে হাতেগোনা দু-একটি রিকশা, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার এবং জরুরি সেবার গাড়ি চলাচল করতে দেখা গেছে। কাঁচাবাজার ও মুদি দোকান ছাড়া শহরের সব মার্কেটের দোকানপাট ছিল বন্ধ।

শুক্রবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মহানগরীর কাশিয়াডাঙ্গা, কোর্টবাজার, শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্বর, শিরোইল বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, সাহেববাজার, নিউমার্কেট, উপশহর নিউমার্কেটসহ মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা। দু-একজনকে মোড়গুলোতে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।

মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পুলিশসহ অন্য সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়। পথচারীদের সচেতন করে মাইকিং করে পুলিশ। যারা রাস্তায় বের হচ্ছে প্রায় প্রত্যেককেই পুলিশের জেরার মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ জানাতে ব্যর্থ হলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া যারা জরুরি প্রয়োজনে বের হচ্ছেন তাদের দ্রুত কাজ শেষ করে ঘরে ফেরার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া ব্যক্তিদের মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সরু রাস্তা দিয়ে যাতায়াতকারী অটোরিকশায় অনেককেই গাদাগাদি করে চলতে দেখা গেছে। এছাড়া যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। মহানগরীজুড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের টহল দেখা গেছে। মহানগরীতে রাজশাহী জেলা প্রশাসনের চারটি এবং ৯টি উপজেলায় ১৮টি ভ্রাম্যমাণ টিম মাঠে ছিল। মহানগরীর প্রবেশপথগুলোতেও পুলিশের বাড়তি নজরদারি দেখা গেছে।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু আসলাম জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রাজশাহীতে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করে কেউ অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাঘুরি করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পথচারীদের সচেতন করে মাইকিং করা হয়েছে।

সিলেট ব্যুরো জানায়, নগরীর সব প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চৌকি বসিয়ে তল্লাশি করে পুলিশ। অতি প্রয়োজনে যারা রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন তারা পুলিশি জেরার মুখে পড়েন। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হলে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া যানবাহন থেকে যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নগরীর বন্দরবাজার, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, পাঠানটুলা, জিন্দাবাজার, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, মদিনা মার্কেট, চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, তালতলাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়-স্বল্পসংখ্যক মোটরসাইকেল, রিকশা চলাচল করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ও ফার্মেসি ছাড়া বাকি সব ধরনের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

খুলনা ব্যুরো জানায়, সকাল থেকে মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। জনসাধারণের উপস্থিতিও ছিল খুব সামান্য। নগরীর রয়্যাল মোড়, শিববাড়ী, ডাকবাংলো মোড়, ময়লাপোতা মোড়, পিকচার প্যালেস মোড়সহ অন্য সব ব্যস্ত মোড় ও সড়ক ছিল জনশূন্য। শহর থেকে কোনো যানবাহন বইরে যেতে পারছে না।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, ভোলা, টাঙ্গাইল, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও মাদারীপুরের শিবচরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কঠোর লকডাউনের প্রথমদিন খুবই কড়াকড়িভাবে পালিত হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন । আজই পাঠিয়ে দিন - write@sarabangla.in