ভোগান্তিতে দিশেহারা সাধারণ রোগী

 
প্রকাশিত: 07/17/2021 at 9:02 am

মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) রাত ৯টা। রাজধানীর উত্তরায় একটি রিকশাকে সজোরে ধাক্কা দেয় একটি ট্রাক। রিকশা আরোহী শিউলি আক্তার (৪০) রাস্তায় ছিটকে পড়েন। তিনি মাথায় মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাৎক্ষণিকভাব তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নিউরো ট্রমা বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।

কর্তব্যরত চিকিৎসকরা প্রথমে রোগীকে ভর্তি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে স্বজনদের অনুরোধে ভর্তি করালেও কোভিড-১৯ পরীক্ষা করার অজুহাতে মুমূর্ষু এ রোগীর কোনো চিকিৎসা করেননি চিকিৎসকরা। একপর্যায়ে বিনা চিকিৎসায় রাত সাড়ে ১২টার দিকে শিউলি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

রোগীর স্বজনদের অনুনয়-বিনয়েও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মন গলেনি। একপর্যায়ে তারা জানিয়ে দেন পরিচালকের নির্দেশ কোভিড পরীক্ষা ছাড়া কোনো রোগীর চিকিৎসা হবে না।

শুধু শিউলি আক্তারই নন, বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে নন-কোভিড (অন্য রোগে আক্রান্ত) রোগীদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রীতিমতো দিশেহারা তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় রোগী নিয়ে একরকম হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। একদিকে কোভিড (করোনা) রোগীরা অক্সিজেন-আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) পেতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। অন্যদিকে আছে শয্যা ও চিকিৎসক সংকটও। এরই মধ্যে রোগীর চাপে রাজধানীর ১৭টি কোভিড-ডেডিকেটেড সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট তৈরি হয়েছে।

ঢাকার বাইরের অনেক হাসপাতালে শয্যার অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসাধীন। সব মিলিয়ে করোনা রোগীদের সেবা দিতেই মহাব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নন-কোভিড রোগীদের বলা হচ্ছে-আগে কোভিড টেস্ট, এরপর অন্য রোগের চিকিৎসা-এমন অজুহাতে জরুরি সেবা দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোভিড, নন-কোভিড সব রোগীর চিকিৎসা সমভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

এ সব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, করোনা চিকিৎসার পাশাপাশি নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ অন্য রোগীদের মৃত্যু সংখ্যা করোনার তুলনায় কম নয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের দায়িত্ব সব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। যে কোনো রোগীর চিকিৎসা একইভাবে গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। অন্যান্য রোগীর ক্ষেত্রে করোনা পরীক্ষার দরকার আছে, তার মানে এই নয় যে, পরীক্ষার নামে চিকিৎসা বন্ধ থাকবে। এক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষার জন্য র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত না হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনার অজুহাতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে বর্তমানে করোনার কারণে ডায়ালাইসিস সেবা এক প্রকার বন্ধ আছে। প্রভাবশালী লোক না হলে বা ভিআইপি পর্যায় থেকে ফোন করাতে না পারলে ডায়ালাইসিস পাচ্ছেন না সাধারণ রোগীরা। এমনকি কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা পাবে না বলে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এছড়া সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের চিকিৎসাসেবা। করোনা আতঙ্কে সেখানে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি চিকিৎসা। করোনা পরীক্ষা করানো না থাকলে কোনো রোগীর এনজিওগ্রাম করানো হয় না জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় এসব রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে করোনা নিশ্চিতে আরটি-পিসিআর করাতে হয়। যে পরীক্ষার ফল পেতে কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ মুমূর্ষু নিউরো বা কার্ডিয়াক রোগীর জন্য ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করা বিজ্ঞানসম্মত নয়।

আরও জানা গেছে, দেশের কোভিড পরিস্থিতির অবনতি হলেও অন্যান্য রোগ থেমে নেই। আগের মতো নিউরো সায়েন্স ও হৃদরোগ হাসপাতালে শয্যা সংকট রয়েছে। এছাড়া ঢাকা, সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে বিভিন্ন বিভাগে আগের মতোই শয্যার অতিরিক্ত রোগী চিকিৎসাধীন। আর চলতি মাসে ডেঙ্গি রোগী বাড়ায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করে সরকারি বেসরকারি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। অথচ তাদের কিছু সহকর্মী করোনার অজুহাত দিয়ে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখেছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এদিকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসাও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এতে ফুরিয়ে আসছে রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড সাধারণ ও আইসিইউ শয্যা। ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১৭টি হাসপাতালের আইসিইউ শয্যায় রোগী পূর্ণ হয়ে আছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং জেলা হাসপাতালে আইসিইউর পাশাপাশি সাধারণ শয্যায় রোগী পূর্ণ হয়ে আছে। কোথাও কোথাও শয্যার তুলনায় চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৫০ বা তার চেয়ে বেশি রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে ১৬টি হাসপাতালে কোভিড-১৯ চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬টি হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। এগুলো হলো কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতাল।

এছাড়া কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সাধারণ শয্যার চেয়েও অতিরিক্ত ৫০ রোগী চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায়ে ২৮টি হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। যার মধ্যে ১০টি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা এবং ৯টি হাসপাতালে সাধারণ শয্যা খালি নেই। এগুলো হলো-ইবনে সিনা হাসপাতাল, এএমজেড হাসপাতাল, ইমপাল্স হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, গ্রীন লাইফ হাসপাতাল, ল্যাবএইড হাসপাতাল, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, জয়নুল হক সিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হাইকেয়ার হাসপাতাল, আল মানার হাসপাতাল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসাধীন আছেন ১১০ জন, কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪০ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসাধীন ১৮৫ জন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১০ শয্যার বিপরীতে কোভিড-১৯ রোগী চিকিৎসাধীন ২০৩ জন।

চাঁদপুরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৬০ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসাধীন রোগী ৭৭ জন। বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ২৩৮ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি আছে ২৪৮ জন।

একইভাবে নাটোর আধুনিক হাসপাতালে শয্যা অতিরিক্ত রোগী ১২ জন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ৫৩ জন, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ২৯ জন। একই অবস্থা দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও মাগুরাতে। এমনকি উপজেলা পর্যায়ে কোথাও ৫ শয্যা কোথাও ১০ শয্যা কোভিড ডেডিকেটেড করা হয়েছে। অনেক স্থানেই সেগুলো পূর্ণ হয়ে আছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার) দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৩ জেলাতেই করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে- ঢাকা, কুমিল্লা, খুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সব জেলাতেই ১ জন থেকে ৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ইতঃপূর্বে এমনটি দেখা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, করোনা রোগী বাড়লে সব চিকিৎসকের দৃষ্টি থাকে তাদের দিকে। এ সময় অন্য রোগীদের অপেক্ষমাণ থাকতে হয়। তবে চিকিৎসা না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষায়িত হাসপাতালে বিশেষ সমসাগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন । আজই পাঠিয়ে দিন - write@sarabangla.in