ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গি

 
প্রকাশিত: 07/25/2021 at 7:43 am

দেশে এডিসবাহিত ডেঙ্গি রোগের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১০৪ জন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি মাসের ২৪ দিনে ডেঙ্গি আক্রান্ত ১ হাজার ২০২ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এমনকি এই সময়ে ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি। দেশে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ডেঙ্গির এই প্রাদুর্ভাবকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা বলছেন, মধ্য আগস্টে এটি পিকে উঠবে। থেমে থেমে বৃষ্টি এবং ঈদুল-আজহার কারণে জমে থাকা পানি ও রক্তে ডেঙ্গি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ডে ডেঙ্গি আক্রান্তদের চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আমাদের দেশে দুই দশক ধরে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। কখনোই এটি নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। মশা নিধনের আধুনিক পদ্ধতিও নেওয়া হয়নি। নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি খুবই দুর্বল। এমনকি মশা নিধনের কীটনাশক আমদানিতে প্রায় ৯০ শতাংশ ডিউটি দিতে হয়। তাছাড়া মশা মারা এবং উৎপত্তিস্থান ধ্বংসের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। কীটনাশক আমদানির অনুমোদন দিয়ে থাকে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। তবে কেউই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মশক নিধনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। ফলে প্রতিবছরই ডেঙ্গিকে সঙ্গী করেই আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে।

কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, রোগী বাড়তে শুরু করেছে। আগস্টের মাঝামাঝি এটা পিকে উঠতে পারে। তাই এটি নিয়ন্ত্রণে এখনই ক্লাস্টার পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। কোন এলাকা থেকে রোগী বেশি আসছে, সেই এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পরবর্তী ১৪ দিন সেসব এলাকা থেকে যদি নতুন রোগী আসে, তাহলে ওই এলাকাগুলো অ্যাক্টিভ ক্লাস্টার হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অ্যাক্টিভ ক্লাস্টারে পরিণত মশা, লার্ভিসাইট ও এডিসের সোর্স ধ্বংস করতে হবে। প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে অন্তত দুইদিন এবং পরবর্তী সময়ে সপ্তাহে একদিন করে মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে। এর পাশাপাশি এবার ডেঙ্গির কোন সেরোটাইপ দ্বারা সংক্রমণ ঘটছে, সেটি নির্ণয় করতে হবে। ২০১৯-এর সেরোটাইপ হলে আতঙ্কের কিছু নেই। কিন্তু যদি অন্য কোনো সেরোটাইপের সংক্রমণ হয়, তাহলে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৪৯ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে রোগী শনাক্ত হয় ৩২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯, মার্চে ১৩, এপ্রিলে ৩, মেতে ৪৩ এবং জুনে ২৭১ জন। জুলাইয়ের ২৪ দিনে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন ৪২২ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪১৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০৪ জন। এ সময় ঢাকার বাইরে ৩ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই তথ্যে ৩ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গি আক্রান্ত হওয়ার পর যাদের হেমোরেজিক বা শক সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে না বা যারা খুব দুর্বল হয়ে পড়ছেন না, তারা পরীক্ষাও করাতে যাচ্ছেন না। ফলে অনেক রোগী থেকে যাচ্ছেন শনাক্তের বাইরে। এছাড়া এখানে শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়। কিন্তু কতজন পরীক্ষা করে পজিটিভ হয়েছেন, অর্থাৎ ডেঙ্গি রোগীর প্রকৃত সংখ্যা জানানো হচ্ছে না। এছাড়া ডেঙ্গির চিকিৎসা দিয়ে থাকেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, কোভিড চিকিৎসা দিয়ে থাকেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা। দেশের ভয়াবহ কোভিড পরিস্থিতির কারণে হাসপাতালগুলোর মেডিসিন ওয়ার্ড কোভিড ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। এমনকি অনেক হাসপাতাল পুরোপুরি কোভিড হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়েছে। সব চিকিৎসক কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত। এই মুহূর্তে ডেঙ্গি ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, করোনা একটি অদৃশ্য শক্তি, যার বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি। কিন্তু ডেঙ্গি আমাদের পরিচিত শত্রু। আমরা জানি, এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গি রোগ হয়। ঘরে-বাইরে পানি জমলেই এই মশা ডিম পাড়ে। সেখানে হাজার হাজার মশা জন্মায়। তাই এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ঘরে-বাইরে কোথাও যেন পানি না জমে। ঘরে ও ঘরের আশপাশের পানি সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। পানি জমলেই মশা জন্মাবে। এছাড়া মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। দিনে-রাতে যখনই ঘুমাবেন, তখনই মশারি টানাতে হবে। ছোট শিশুকে ফুল শার্ট-প্যান্ট পরাতে হবে। কোথাও যেন মশার লার্ভা জন্মাতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে মশক নিধন করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা ডেঙ্গি রোগী পাচ্ছি। তাই সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

৩ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা মৌসুম-পূর্ব এডিস সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটির ৩২নং ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স (একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মশার লার্ভার ঘনত্ব) সর্বোচ্চ ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়া ও ইকবাল রোড। এছাড়া দক্ষিণ সিটির ৪৮নং ওয়ার্ডের ব্রুটো ইনডেক্স সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে সায়েদাবাদ ও উত্তর যাত্রাবাড়ী এলাকা।

২৯ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত এই সার্ভে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪টি ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স ১০ থেকে ২০-এর মধ্যে। এগুলো হলো-১৩নং ওয়ার্ড (মনিপুর, পীরের বাগ, শেওড়াপাড়া); ৩১নং ওয়ার্ড (নূরজাহান রোড, আসাদ এভিনিউ, শাহজাহান রোড); ৩৫নং ওয়ার্ড (মগবাজার, নিউ ইস্কাটন); ৩৬নং ওয়ার্ড (মধুবাগ, নয়াটুলা, মিরবাগ) এলাকা। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ৬টি ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স ১০ থেকে ২০-এর মধ্যে পাওয়া গেছে। এগুলো হলো-১২নং ওয়ার্ড (মালিবাগ, গুলবাগ, শান্তিবাগ); ১৯নং ওয়ার্ড (মিন্টু রোড, বেইলি রোড, কাকরাইল); ৩৪নং ওয়ার্ড (সিদ্দিকবাজার, ওসমান গণি রোড); ৩৮নং ওয়ার্ড (ঠাটারি বাজার, গোপী মোদন মোহন বসাক লেন, মোদন মোহন বসাক লেন); ৩৯নং ওয়ার্ড (আরকে মিশন রোড, অভয় দাশ লেন); ৪৬নং ওয়ার্ড (মিল ব্যারাক, আলমগঞ্জ রোড, অক্ষয় দাশ লেন)।

প্রাক-মৌসুম জরিপ ২০২১-এ মেঝেতে জমানো পানিতে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ২২ শতাংশ ডেঙ্গি মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া প্লাস্টিক ড্রামে ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ, প্লাস্টিক বালতিতে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ, পানির ট্যাংকে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ, পানির মিটারের গর্তে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ফুলের টব ও ট্রেতে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ, প্লাস্টিক বোতলে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং লিফটের নিচে ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৯ সালে ডেঙ্গিজ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিল শিশু, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী ২০১৯ সালে আইইডিসিআর থেকে ডেঙ্গি সন্দেহে ২৭৬ জনের মৃত্যুর তথ্য আসে। বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনায় এর মধ্যে ১৭৯ জনের ডেঙ্গিজনিত মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালগুলোর নন কোভিড অংশে ডেঙ্গির চিকিৎসা চলছে। তবে যেভাবে রোগী বাড়ছে তাতে ডেঙ্গি ও কোভিড একসঙ্গে চিকিৎসা করানো বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গি রোগের ন্যাশনাল গাইডলাইন আপডেটের কাজ চলছে। তিনি বলেন, জ্বর হলে ঘরে বসে না থেকে সবাইকে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতে হবে এবং পজিটিভ হলে অবশ্যই চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

 

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন । আজই পাঠিয়ে দিন - write@sarabangla.in