মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্যঘুম উড়েছে লকডাউনে। মনে হচ্ছে, যেন পালিয়ে গিয়েছে। এ বার কী ভাবে ফিরবেন নিদ্রাদেবী? কোন সাধ্যসাধনাতেই বা ফিরবেন তিনি?লকডাউনের ঘোষণা হওয়ার পর মনে মনে কিছুটা খুশিই হয়েছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্মী অহনা সামন্ত। তিনি ভেবেছিলেন, লকডাউনে খানিকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচা যাবে, নিত্যদিনের দৌড়ঝাঁপ থেকে নিষ্কৃতি মিলবে। ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ হওয়ায় সময় দেওয়া যাবে ‘সেল্ফ গ্রোথ’-এও। লকডাউনের দু’মাসের মাথায় সেই অহনাই কলকাতার এক নামী মনোরোগ বিশেষজ্ঞর দ্বারস্থ হয়েছেন। বাড়িতে থেকেও ঘুমের রুটিন উল্টে গিয়েছে তাঁর। ঘুমোতে যাচ্ছেন কখনও ভোর ৫টা, কখনও ৬টায়। ঘুম ভাঙছে দুপুর ১টার পর। দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত টানা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ঝক্কি সেরে ক্লান্ত বোধ করলেও রাতে ঘুমের দেখা নেই।নিউ টাউনের অভিষেক বিশ্বাসের সমস্যা হল, ঘুমের ভারসাম্য বলে তাঁর এখন কিছু নেই। কখনও তিনি ঘুমোচ্ছেন দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা। কখনও আবার টানা দু’দিন ঘুমই নেই। মনোবিদের সঙ্গে অভিষেক যোগাযোগ করার পর ধরা পড়েছে, চাপা উদ্বেগ ঘুম উড়িয়েছে তাঁর। অভিষেক এখন ‘অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারে’ আক্রান্ত!লকডাউন চলছে ৭১ দিন ধরে। এই সময়ের মধ্যে বহু মনোরোগ বিশেষজ্ঞই ঘুম হারানো মানুষদের কাছ থেকে সব চেয়ে বেশি ফোন পেয়েছেন! কিন্তু কেন? মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই জানাচ্ছেন, করোনার জেরে লকডাউন ও লকডাউনের জেরে জীবিকা হারানোর ভয়, প্রাক-লকডাউন সময়কার রুটিন বাঁধা জীবনযাপনে ছেদ, আচমকাই বেড়ে যাওয়া মোবাইল ও ল্যপটপের স্ক্রিনটাইম— এমন নানা কারণ রয়েছে ঘুম ওড়ার পিছনে।একটি নামী ম্যাট্রেস প্রস্তুতকারক সংস্থা সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়েছে ভারতের নাগরিকদের ঘুমের সময়সীমার উপর। সেখানে দেখা গিয়েছে, ২৫ মার্চের আগে দিনে ৬ ঘণ্টারও কম ঘুমোনো মানুষ যেখানে ছিলেন ২৬ শতাংশর আশেপাশে, সেখানে দু’মাসের লকডাউনের পর সেটা বেড়ে হয়েছে ৪৪ শতাংশ! প্রসঙ্গত, এই রাজ্যে লকডাউন শুরু হয় ২৩ মার্চ বিকেলে।তা ছাড়া, ওয়ার্ক ফ্রম হোমের দৌলতে কাজে যাওয়া বা বাড়ি থেকে বেরোনোর তাড়া না- থাকায় জীবন থেকে অনেকের আগেকার রুটিন হারিয়েছে। অফিসের কাজ, টিভি দেখা সবটাই বিছানায় সারার ফলে ঘুমোনোর সময়ে বিছানার প্রতি বাড়তি আকর্ষণটা থাকছে না। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ঘুমের ব্যাঘাতের পিছনে এটাও একটা কারণ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি নিয়োগী বলছেন, ‘বাইরে বেরিয়ে লোকজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ এখন নেই। মোবাইল, ল্যাপটপ, টিভি স্ক্রিনেই চোখ রেখে সময় কাটাচ্ছেন মানুষ। ফলে, অনেকের ঘুমের ধরন বা ধাঁচে প্রভাব পড়েছে।’বিশেষজ্ঞদের কারও কারও কথায়, ‘একদিকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জেরে ঘুম ঠিক মতো হচ্ছে না। আবার ঘুম না-হওয়ায় সারা দিনের ক্লান্তিবোধ, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার জেরে উদ্বেগের প্রবণতাও বাড়ছে। এটা অনেকটা দুষ্টচক্রের মতো।’এখন উপায়? মনোবিদ সাহেলী গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে স্নান, খাওয়ার অভ্যাসটা বজায় রাখতে হবে। ওয়ার্ক ফ্রম হোমেও টেবিল-চেয়ারে বসে অফিসের পোশাকে কাজ করার চেষ্টা করুন, নিয়মিত মেডিটেশন করুন আর সামাজিক যোগাযোগটা বজায় রাখার চেষ্টা করুন।’ রাজর্ষির পরামর্শ, ‘ঘুম ভাঙলেই বিছানা ছাড়ুন। রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যেতে চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে ঘুমোনোর আগে স্নান সেরে হালকা গান চালিয়ে দিন। মোবাইল, ল্যাপটপের চোখ রাখার বদলে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বই পড়ুন। এবং অবশ্যই নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।’

Source link

Comments

comments