এই সময়, বহরমপুর: করোনা আতঙ্কে পরিবারের লোকেরা থেকেও নেই। বাধ্য হয়ে বেলডাঙার মহেশপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের দেহ সৎকারে এগিয়ে এলেন এলাকার মুসলিম যুবকরা। পাঁচ দিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসককে দেখিয়েছিল পরিবার। কিন্তু শনিবার ভোরে অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ কর্মকার(৬৫)-এর মৃত্যুর পর এলাকায় রটে যায় করোনাতে মৃত্যু হয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়-স্বজনরা শুধু ফোনে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আর কেউ এগিয়ে আসেননি। মৃতের স্ত্রী শরণাপন্ন হন পঞ্চায়েত সদস্য স্বামী কামরুজ্জামানের। অনুরোধ শুনে আর বসে থাকেননি কামরুজ্জামান। সঙ্গীদের জুটিয়ে এনে বাড়ি থেকে মৃতদেহ বের করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। মৃত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের স্ত্রী পূর্ণিমা কর্মকার বলেন, ‘কয়েকদিন ধরেই জ্বরে ভুগছিলেন। চিকিৎসক যদিও করোনার ব্যাপারে কিছু বলেননি। যেহেতু জ্বরে মারা গেছেন সেই কারণে সকলেই আসতে ভয় পেয়েছিল। পাড়ার ছেলেরা এসে মৃতদেহ সৎকার করার ব্যবস্থা না করলে যে কী হত জানি না।’ শিক্ষক হিসেবে এলাকায় যথেষ্ট সুনাম রয়েছে মহেশপুরের নরেন্দ্রনাথ কর্মকারের। চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন বছর পাঁচেক আগে। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসার। মেয়ের বিয়ের হয়েছে অনেক দিন আগে। একমাত্র ছেলে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে থাকেন একই বাড়িতে, বাবা-মায়ের সঙ্গে। গ্রামের বাড়িতে একটি সোনার দোকান রয়েছে ছেলের। বয়সের কারণে কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন নরেন্দ্রনাথ। পাঁচ দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় বেলডাঙা সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসককে দেখিয়ে আনে পরিবার। তবে উপসর্গ না-থাকায় চিকিৎসক করোনা পরীক্ষার জন্য কোনও নির্দেশ দেননি। শুক্রবার রাতে হঠাৎ-ই শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর শনিবার ভোরে মারা যান ওই শিক্ষক। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে ঘরের মধ্যে মৃতদেহ পড়ে থাকলেও কেউ ঢুকতে সাহস করেনি। এরপরই মৃতের স্ত্রীর কাছে খবর পেয়ে পঞ্চায়েত সদস্য কামরুজ্জামান, ইসমাইল, এক্রামূল, ববি-সহ অন্য সঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে হাজির হন ওই বাড়িতে। এরপর সকলে মিলে মৃতদেহ বের করে আনেন ঘর থেকে। বাড়ি থেকে আনা স্যানিটাইজার মৃতদেহের উপর ছড়িয়ে দিয়ে তুলসি তলায় দেহ রাখেন তাঁরা। বাগান থেকে বাঁশ কেটে নিয়ে এসে দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য খাট তৈরি করার পর ছোট লরি ভাড়া করে বেলডাঙার সুজাপুরে শ্মশানের উদ্দেশে রওনা দেন সকলে। তবে কামরুজ্জামান, ইসমাইলদের হাত লাগাতে দেখে এগিয়ে আসেন কয়েকজন প্রতিবেশী। কামরুজ্জামান বলেন, ‘ঘণ্টা পাঁচেক ধরে মৃতদেহ বাড়ির মধ্যেই পড়েছিল। এ কথা শোনার পর আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। যদিও এরপর প্রতিবেশী কয়েকজন যুবক আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়।’মৃত শিক্ষকের ছেলে অঞ্জন কর্মকার বলেন, ‘কামরুজ্জামানদা না-থাকলে আমাদের খুব অসুবিধের মধ্যে পড়তে হত। ওই দাদাদের চেষ্টাতেই বাবার সৎকার করতে পারলাম। ওদের কাছে আমরা সত্যিই কৃতজ্ঞ।’ জেলা পরিষদের সভাধিপতি মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের জেলায় হিন্দু-মুসলিমের কোনও বিভেদ নেই। একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়ানোটাই রীতি।’

Source link

Comments

comments