পার্থসারথি সেনগুপ্তসর্ষের তেলের দামের ঝাঁজেই চোখে জল এসে যাওয়ার জোগাড় বেলঘরিয়ার বধূ মিতালি রায়ের মতো অনেকেরই। যে ব্র্যান্ডের তেল দিন কয়েক আগেও কেনা যাচ্ছিল ১১০ বা ১১৫ টাকা লিটার দরে, তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫। অন্য কোনও কোনও ব্র্যান্ডের দাম ১৬০-১৭০ টাকা ছুঁয়েছে। মিতালির আক্ষেপ, ‘মাছ ভাজতে তো তেল লাগবেই। দামের চোটে হেঁশেলে তেল ঢোকাও এ বার বন্ধ হবে মনে হয়। ‘ নিত্যপ্রয়োজনীয় আলু-পেঁয়াজের মতোই অগ্নিমূল্য শুধু সর্ষের তেল নয়, অন্যান্য ভোজ্য তেলও। যে সর্ষের তেল গত বছরও মিলত গড়পড়তা ৯০ টাকা লিটার দরে, তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ১৩৫-১৫০ টাকা। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ টাকা লিটার-প্রতি দাম বেড়ে রাইস ব্রান অয়েল ১২০ টাকা লিটার দরে কিনছেন ছাপোষা গৃহস্থ। একই সময়ে বাদাম তেলের দাম ১৫৬ টাকা থেকে হয়েছে ১৭০ টাকা, সয়া অয়েল ৯৫ টাকা থেকে ১১৩ টাকা, সানফ্লাওয়ার অয়েল ১০২ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পাম অয়েল ৮৫ টাকা থেকে ১০৪ টাকা। পোস্তাবাজারে হরিশ গোয়েলের মূল ব্যবসা সর্ষের তেলের। তিনি বলছেন, ‘দাম বাড়াটা সত্যি সমস্যার। বাঙালিদের রান্নার অন্যতম উপকরণ সর্ষের তেল। আমি ব্যক্তিগত ভাবে নিরামিষাশী। কিন্তু ভাজাভুজিতে সর্ষের তেলে স্বাদটা খোলে। বাঙালির মাছ ভাজা পাম অয়েল বা রাইস ব্রান অয়েলে হলে ঝাঁজটা আসে না।’ হরিশের মতে, পশ্চিমবঙ্গে ততটা না হলেও সর্ষের মূলত চাষ রাজস্থান, হরিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যে। আবহাওয়াগত কারণে চাষে খানিকটা ক্ষতি হয়েছে। করোনাকালের গোড়ায় পর্যাপ্ত কৃষিশ্রমিক না মেলাতেও সমস্যা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সাধারণত আমরা এতদিন লক্ষ করতাম পশ্চিমবঙ্গেই সর্ষের তেলের চাহিদা বেশি। করেনার সময় অন্যান্য রাজ্যে, এমনকী কাশ্মীরেও এই তেলের চাহিদা ছিল চোখে পড়ার মতো। মানুষের বিশ্বাস ছিল, অতিমারীর সময়ে সর্ষের তেল বেশি স্বাস্থ্যকর। জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যের অভাব মূল্যবৃদ্ধিতে অনুঘটক হয়েছে।’ পোস্তাবাজার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সুভাষ বনশল অবশ্য তেলের দাম বাড়ার জন্য মূলত আন্তর্জাতিক বাজারকেই দায়ী করেছেন। বর্ধমানে একটি রাইস অয়েল মিল চালায় সুভাষের সংস্থা। তাঁর বাখ্যা, ‘আমাদের পশ্চিমবঙ্গে কিছুটা রাইস অয়েল হয়। তবে সর্ষে বাদে অন্য গোত্রের ভোজ্য তেলের জন্য আমাদের মুলত অন্য দেশগুলির উপরে নির্ভর করতে হয়। যেমন, সয়া তেলের জন্য আমেরিকা, ব্রাজিল, কানাডা। পাম অয়েলের জন্য ইন্দোনেশিয়া, মালেয়েশিয়া। আবার বাংলাদেশ থেকে ‘ক্রুড’ রাইস অয়েল আসে। চলতি বছরে বিদেশের বাজার চড়া। তাই আমরাও ভুগছি।’ ফোরাম অফ ট্রেডার্স অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ কোলের কথায়, ‘আমি পেশায় ব্যবসায়ী হলেও উপভোক্তাও বটে। পাইকারি বাজারে সর্ষের তেলের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়াটা মহা চিন্তার।’ ভোজ্য তেলের উপর আমদানি শুল্কের হার কমলে ক্রেতা ও বিক্রেতা, উভয়েই স্বস্তি পেতে পারেন বলে মনে করছেন কনফেডারেশন অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুশীল পোদ্দার। পাম অয়েলের উপর দিন তিনেক হল কিছুটা শুল্ক কমলেও বাজারে প্রভাব পড়তে সময় লাগবে। আশার আলো দেখিয়েছেন নবান্নের কৃষি-উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার। তিনি বলেন, ‘মূলত শুষ্ক আবহাওয়ার রাজ্যগুলিতেই সর্ষে হয়। তবুও রাজ্য সরকারের প্রয়াসে পশ্চিমবঙ্গে সর্ষের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। বাঙালির প্রিয় রান্নার তেল হিসেবে সর্ষের উৎপাদন আরও বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা।’

Source link

Comments

comments