Category Archives: Art-&-Literature

৪ সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও মেলেনি পরিষেবা, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বাগদার যুবকের

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: একাধিক সরকারি হাসপাতালে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হল বনগাঁর এক যুবকের। জানা গিয়েছে, শুক্রবার রাত থেকে শহরের ৪ টি হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা পাননি ওই যুবক। পরে শনিবার ভোরে মৃত্যু হয় তাঁর। যুবকের মৃত্যুর পরই কান্নায় ভেঙে পড়েছে পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, হাসপাতালের দোষেই প্রাণ গেল যুবকের।

জানা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার বাসিন্দা সঞ্জয় মণ্ডল। শুক্রবার হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তড়িঘড়ি তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে। প্রাথমিকভাবে তাঁকে পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান, সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে সঞ্জয়ের। ওই হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই। সেই মুহূর্তেই তাঁকে রেফার করা হয় আরজিকর হাসপাতালে। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে নিয়ে আসে আরজিকরে। সেখানে সিটি স্ক্যান করা হয় সঞ্জয়ের। রাতে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সঞ্জয়কে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এসএসকেএম হাসপাতালে।

[আরও পড়ুন: পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষ, ফের উত্তপ্ত তুফানগঞ্জ]

সঞ্জয়কে নিয়ে এসএসকেএমে পৌঁছতেই হাসপাতালের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, রোগীর যা পরিস্থিতি তাতে ওই হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব নয়। এরপর তাঁকে পাঠানো হয় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। ওই হাসপাতালের তরফে জানানো হয়, যে পরের দিন অর্থাৎ শনিবার সকালের আগে ওই রোগীকে পর্যবেক্ষণ করার মতো কোনও চিকিৎসক হাসপাতালে আসবেন না। সেখান থেকে রাতেই সঞ্জয়কে পাঠানো হয় কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। পরে শনিবার সকালে সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বাগদার যুবক।

পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালের উদাসীনতার জেরেই এই নির্মম পরিণতি হয়েছে সঞ্জয়ের। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন যুবকের পরিবারের সদস্যরা। কেন শহর কলকাতার বুকে ৪ হাসপাতালে ঘুরেও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হল ওই যুবকের? প্রশ্ন উঠছে হাসপাতালের ভূমিকা নিয়ে।

[আরও পড়ুন: আবরার হত্যায় কড়া পদক্ষেপ নিল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়, আজীবন বহিষ্কৃত ২৬ পড়ুয়া]

The post ৪ সরকারি হাসপাতালে ঘুরেও মেলেনি পরিষেবা, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বাগদার যুবকের appeared first on Sangbad Pratidin Home.

Source link

বিশ্বাস – স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার গল্প (18+)

-আপা বিশ্বাস কর আমি দুলাভাইকে ই দেখসি সায়মা আপার সাথে।
-তোর চোখের ডাক্তার দেখা। ইফতি কাল মিটিংয়ে ছিলো। আজে বাজে কথা বলিস না তো।
-আপা আমি কি তোমাকে মিথ্যা বলব?
আমার এতে স্বার্থ কিসে?
-এত কিছু বুঝি না। আমাকে ফার্দার এধরনের কথা বলবি না। ইফতি কি আমি জানি আমাকে এসব শিখাতে আসবি না।

ফোন টা ধুপ করে কেটে দিলাম। মেজাজ টাই খারাপ হয়ে গিয়েছে।
ইফতির ব্যাপারে আমি একটা আজে বাজে কথা শুনতে পারি না। সহ্য হয় না। আমার ছোট ভাই কাকে না কাকে দেখে এমন বিশ্রী একটা দোষ দিলো ইফতির্। ও যদি জানতে পারে কত কষ্ট পাবে। আর সায়মা। ইসসস আমার ছোট বেলার বান্ধবী। ওকে ইফতি বোনের চোখে দেখে। ও ই যদি শুনতে পারে যে ওকে আর ইফতিকে নিয়ে আমার আপন ছোট ভাই বলেছে তাদেরকে নাকি ও গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় চুমু খাচ্ছে। ছি ছি!
আমার মুখটা কই থাকবে। এমন কথা কেমন করে বলি?
না এই কথা বলা যাবে না ইফতি কে।
ও ভাববে আমি অবিশ্বাস করে এই প্রশ্ন করেছি। আমি সায়মা আর ইফতি একই সাথে ভার্সিটি তে পড়তাম। ইফতি আর আমার প্রেম ছিলো সেই শুরু থেকে। তারপর ওর চাকরি আর আমাদের বিয়ে। সায়মা বেচারির তো নিজেরই কপাল টা খারাপ। বিয়ে হয়েছিলো। জামাই মারধর করত। একসময় ডিভোর্স হয়ে গেলো। আমি আর ইফতিই তো ওকে সাপোর্ট করেছি। আর সেই সম্পর্ক নিয়ে এত বাজে চিন্তা ভাবনা।
ছি ছি!
কলিংবেল এর আওয়াজ ……
ইফতি বাসায় এসেছে .. আমি আর একমুহুর্ত এসব নিয়ে ভাবব না। না বাস না।
দরজা খুলতেই ইফতি আমার দিক তাকিয়ে কাছে এসে জড়িয়ে ধরল।
-বাবু সন্ধ্যা এত দেরিতে হয় কেন? আমি তোমার চেহারা দেখার জন্য ঘড়ির দিক তাকিয়ে থাকি। চাকরিটাই ছেড়ে দিবো।
-আরে পাগল বলে কি?
চাকরি ছাড়তে হবে কেন?
আমি কি কোথাও পালায়া যাচ্ছি?
-তারপর ও বৌ ছেড়ে অফিস করা অনেক পেইন গো। তুমি বুঝবে না… যাইহোক আজ আমরা বাইরে খাবো।
-কেন? আমি এত কষ্ট করে রান্না করেছি।
-ঐটাও খাবো …পরে খাবো। তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হউ তো।
-কিন্তু ……
-কোন কিন্তু নাই। আজ আমরা বাইরে খাবো।
-আচ্ছা তুমিও জামা বদলে নেও। আমি রেডি হচ্ছি।
আমি বাথরুমেই ঢুকসিলাম এমন সময় ইফতি হাত টান দিয়ে বলল
-ম্যাডাম আমার সামনেই চেঞ্জ করুন। আমি তো আপনার একমাত্র স্বামী।
-যাহ পাগল! কি সব কথা। রেডি হতে দেও। দুষ্টামি পরে হবে।
-পরে হবে তো?
-হ্যাঁ হবে .. এখন ছাড়ো।
আমি হাসতে হাসতে শেষ .. জামা পাল্টাচ্ছি আর ভাবছি। ইফতি যে আমাকে কত ভালোবাসে তা তা শুধু আমিই জানি। একদিনও আমার সাথে কোন ঝগড়া করে নি বিয়ের পর। আমার সব রাগ ভালোবাসাকে এত সহজে মানিয়ে নিয়েছে। আর সেই ইফতিকে নিয়ে আমার ভাই কিভাবে এমন একটা কথা টা বলল?
আমি রেডি হয়ে বের হওয়ার পর ইফতির প্রথম কথা
-মা শা আল্লাহ আমার পরীটাকে এত সুন্দর লাগছে মনে হচ্ছে আজকে তোমাকে এক জায়গায় বসিয়ে মন ভরে দেখি।
-আর কোনদিন সুন্দর লাগে না বুঝি?
-সবসময় লাগে। আমার বৌ সবচেয়ে সুন্দর।
-এখন তুমি রেডি হচ্ছো না কেন? শার্ট বদলাবে না?
-না শার্ট বদলাতে লাগবে না। আচ্ছা শুনো তনু।
-হুম বলো।
-তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে।
-ইসস আল্লাহ এত ঢং কই থেকে পাও তুমি?
-হায়রে সত্যের দাম নাই।
-না নাই। চলো বের হও। আমরা কই যাবো?
-তুমি যেখানে বলবে। তোমাকে আজ বেহেশতে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে।
-যা বলো না? চলো
আমরা বের হয়ে গেলাম। পুরা বাসায় আমরা দুইটা প্রাণীই থাকি। একটা ছুটা বুয়া আছে। কাজ শেষে চলে যায়। আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষ থাকে গ্রামের বাড়িতে। শ্বশুর নাই। শ্বাশুড়ী সেই ভিটা ছেড়ে এক বিন্দু নড়তে নারাজ। তাই আমরা টোনাটুনি নিজেরাই সংসার বেঁধে নিয়েছি। আমার খুব পছন্দের একটা রেস্টুরেন্টে ইফতি আমাকে নিয়ে গেলো। যখন প্রেম করতাম এখানেই ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিতাম দুজন মিলে। আজ এখানে বিয়ের পর প্রথম আসলাম।
রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই সবাই বলে উঠলো
” হ্যাপি এনিভার্সেরি মিসেস ইফতি”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সম্পূর্ণ রেস্টুরেন্টে শুধু আমি আর ইফতিই কাস্টমার .. বেলুন মোম আর ফুল দিয়ে সাজানো। অর্থাৎ ইফতি আগে থেকেই এসব প্লান করে রেখেছিলো।
একটা টেবিলে কেক রাখা। এসব কিছু দেখে আমি ইফতিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম
-তোমার সব মনে ছিলো? আমি ভাবসিলাম কাজের চাপে ভুলে গিয়েছো।
-কিভাবে ভুলি এদিনের কথা যেদিন তোমাকে আমি আমার করে কাগজে কলমে আর কলমা পড়ে পেয়েছি?
-এ যাহ একটা ভুল হয়ে গিয়েছে।
-কি? আমার জন্য গিফট নেও নি সেটা?
-এটা তো আছেই আরো একটা ভুল করেছি।
-কি?
-আমাদের বিয়ের দিনই তো সায়মার জন্মদিন .. আমি ভুলেই গেসিলাম। দাড়াও ওকে একটু উইশ করে নেই।
-আহা পরে করো। আসো কেক কাটো।
-দুইটা মিনিট জান। একটু অপেক্ষা করো।
ইফতি গিয়ে বসলো। আমি সায়মাকে ফোন দিলাম উইশ করতে
-দোস্ত হ্যাপি বার্থডে
-থ্যাংকস ..কেমন আছিস?
-এই তো দোস্ত ভালই। সরি একটু লেট হয়ে গেলো রে।
-আরে না ঠিক আছে। তুই কি বাইরে?
-হ্যাঁ রে ইফতি নিয়ে এসেছে বাইরে। আজ আমাদের বিবাহ
বার্ষিকী ভুলে গেসিস?
-ও হ্যাঁ তাই তো।
-আরে তোকে কি বলবো। আমিই তো ভুলে গিয়েছিলাম। হাহাহাহা … ইফতি সন্ধ্যার পর থেকে একের পর এক সারপ্রাইজ দিয়ে আমাকে পাগল বানিয়ে ফেলল।
-ওহ ভালো তো। সুন্দর সময় কাটা। রাখি আমি।

-আচ্ছা বাসায় আসিস … কেমন? আল্লাহ হাফেজ।
ফোন কেটে আমি আর ইফতি একসাথে কেক কাটলাম। ইফতি শুরু থেকেই খুব রোমান্টিক … আমিই একটা ভেবলা। এসব কেন যেন আমাকে দিয়ে হয় না। বুঝি না আমি এমন কেন? আমরা একসাথে ডিনার করলাম। এরপর কিছুক্ষণ গাড়িতে ঘুরলাম। অনেক গুলা ছবি তুললাম। হাতির ঝিলের ব্রিজে দাড়িয়ে ইফতি আমাকে জিজ্ঞেস করলো
-আচ্ছা তনু তুমি কি চাও?
-কোন ব্যাপারে?
-গিফট কি চাও পাগলি?
-ওহ ওহ সরি। আমি চাইলে তুমি দিবে?
-হ্যাঁ দিবো তো। বলো।
-ইফতি আমাদের বিয়ের দুইবছর হলো। আমরা কি বাচ্চার ব্যাপারে প্লান করতে পারি?
ইফতি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল
-হ্যাঁ অবশ্যই পারি। তনু আমি নিজেও চাচ্ছিলাম আমরা এখন একটা বাবু নেই। তুমি আমার মনের কথাটা বলেছো ।
এই বলে ও আমার কপালে চুমু খেলো।
আমি অনেক সৌভাগ্যবতী তাই ইফতিকে আমার স্বামী হিসেবে পেয়েছি। ও অনেক ভালো মানুষ … আমি ওকে যতটা না ভালোবাসি তার চেয়ে বেশি ও আমাকে বাসে।
আর কিছুক্ষণ সেখানে দাড়িয়ে আমরা বাসায় চলে গেলাম। বাসায় ফিরে আমি আবার অবাক। কাজের বুয়ার কাছে বাসার এক্সট্রা চাবি সবসময় থাকে। উনাকে বলে ইফতি লোক দিয়ে আমাদের রুম টা সাজিয়েছে। একেবারে বাসর রাতের মত। এত সুখ কই রাখি আমি? কই রাখি?
আমি কেঁদে ফেললাম। বুয়া যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে বলল
-মা বেঁচে থাকো। এমন স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার্। এই স্বামীকে কখনো কষ্ট দিও না।
বুয়া না বললেও আমি জানি আমাকে ইফতি কতটা ভালোবাসে। এ আমাকে কারো বলতে হবে না। বুয়া চলে যাওয়ার পর ইফতি আমার পিছনে দাড়িয়ে আছে বিয়ের শাড়িটা নিয়ে।
-তনু আজ তোমাকে বউ সাজে দেখতে চাই। যাও না একটু সেজে আসো।
আজ ইফতি জান চাইলে জানটাও দিয়ে দিতাম। আর এত সামান্য শখ ওর।
বিয়ের শাড়ি পরতে আমি অন্য রুমে গেলাম। রুম থেকে বের হতেই ইফতি আমাকে কোলে তুলে আমাদের শোবার ঘরে নিয়ে গেলো।
-এই তুমি এমন কেন?
-কেমন তনু?
-এইযে আমাকে এত ভালোবাসো কেন?
-তা তো জানিনা। ভালো না বেসে উপায় আছে?
– এখন নামাও আমাকে। ব্যাথা পাবা।
-তোমাকে উঁচু করার মত শক্তি বুঝি আমার নাই?
-এখন থেকে প্রাকটিস করছো মরার পর আমার লাশ উঁচু করার?
-ধুর এমন কথা একদম বলবে না তনু। ভালো লাগে না। নামো তুমি নিচে।
ইফতি রেগে গেলো। সেই রাগ ভাঙ্গাতে আমার কত কিই না করতে হলো। কখনো কান ধরে উঠবস আবার কখনো গান গেয়ে নেচে তাকে স্বাভাবিক করা হলো। অবশেষে সকল রোমান্সের পর ঘুমিয়ে পড়লাম দুইজন। ………………………………
রাতটা যত রোমান্টিক কাটলো। সকাল টা আরো সুন্দর্। দুইবছরের বিবাহ বার্ষিকী তে আবার বাসর রাতের আমেজ। চোখ খুলে দেখি ইফতি রেডি হয়ে গিয়েছে।
-আল্লাহ সরি গো আমি আজ উঠতে পারলাম না কেন?
-তনু ঘুমাও তুমি। তোমার উঠতে হবে না। আমি ছোট বাচ্চা না। আমি একা রেডি হতে পারি তো। আর আমি নাস্তাও বানিয়েছি। তুমি আরো এক ঘন্টা ঘুমিয়ে তারপর লক্ষী মেয়ের মত নাস্তা করবে। আর তোমার জন্য অনেক কষ্ট করে ইউটিউব দেখে আমি ক্ষীর বানিয়েছি..
-তুমি ক্ষীর বানিয়েছো। বলো কি?
-হ্যাঁ ..সেটাও তুমি খাবে। আজকে বুয়া কে আসতে মানা করেছি। আমি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসবো। এরপর আমরা মুভি দেখতে যাবো।
-ইফতি এত ভালোবেসো না আমাকে জান।
আমি তখনো বিছানায় শুয়ে আছি। ইফতি আমার পাশে এসে বসে বলল
-আমি বাসবো না তো কে বাসবে?
তোমাকে ভালোবাসবো না তো কাকে বাসবো?
-আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ইফতি।
-আমিও অনেক ভালোবাসি। এখন আমি অফিসে যাই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ফিরি। তারপর আবার আদর হবে। তুমিও একটু রেস্ট নেও। আদর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে যাবা।
-যাহ ফাজিল। যাও যাও তাড়াতাড়ি যাও।
ইফতি কে আমি গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলাম। শাড়ি কোন রকমে এক পেচ দিয়ে বিছানা থেকে নেমেছিলাম। এত ভারী আমার শাড়িটা কি আর বলব?
ভাবলাম শাওয়ার নিয়ে আগে নাস্তা করি তারপর কিছুক্ষণ আবার ঘুমাবো।
এমন সময় আবার কলিংবেল এর আওয়াজ। নিশ্চয়ই ইফতি কিছু ফেলে গিয়েছে। দৌড়ে দরজা খুলতেই দেখি সায়মা।
-আরে দোস্ত তুই? এত সকালে?
-এইত মনটা ভালো ছিলো না। তাই ভাবলাম তোর সাথে একটু দেখা করে যাই।
আমার শাড়ি তখন শুধু শরীরে পেচানো। সায়মা যতই ভালো বান্ধবী হোক কেমন লজ্জা যে লাগছিলো আমার্। কি ভাববে ও? আমি লজ্জায় লাল টুকটুক।
-দোস্ত একটু বসবি? আমি একটু শাওয়ার নিয়ে আসি। তারপর এক সাথে নাস্তা করবো।
-তুই এই অবস্থায় নাস্তা বানিয়েছিস?
-আরে না রে ইফতি বানাইছে সব। আজকে তো সে আমার জন্য স্পেশালী ক্ষীর ও রান্না করছে।
-ওহ ভালো। তোদের ভালোবাসা দেখলে আমার খুব হিংসা হয়।
-মন খারাপ করিস না। দেখিস তোর ইফতির চেয়েও লক্ষী বর আছে কপালে।
-হুম বুঝলাম।
-তুই তো মন খারাপ করে আছিস। দাড়া তোকে ইফতির বানানো ক্ষীর খাওয়াই।
-তুই খাবি না?
-খাবো আগে তুই খা। আর বল আমার বর এর হাতের ক্ষীর কেমন?
আমি চামচ দিয়ে পেয়ালায় তুলে ক্ষীর আনলাম সায়মার জন্য। নিজের হাতে সায়মার মুখে তুলে দিলাম।
সায়মা ক্ষীর শেষ করে বলছে

-হুম ভালো রান্না করেছে। মজাই হয়েছে।
-হায়রে আমিই এখনো খেলাম না একটু .. আমি একটু ব্রাশ করে আসি। তুই বসে টিভি দেখ।
-একটু পানি দে তো।
আমি পানি আনতে রান্না ঘরে গেলাম। পানি হাতে ফিরে এসে যা দেখলাম তা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
সায়মা মাটিতে লুটিয়ে আছে। ওর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে …
আমি এক চিৎকারে ডেকে উঠলাম
-সায়মা কি হইসে তোর?
সায়মা গোঙ্গাচ্ছে। কিছুই বলতে পারছে না। আমি মোবাইল খুঁজে চলছি আমার… কোথাও পাচ্ছি না। মোবাইল টা গেলো কোথায়? কাল রেস্টুরেন্ট থেকে ফেরার পর আর মোবাইল বের করা হয় নি ব্যাগ থেকে। হারিয়ে ফেললাম না তো?
এখন কি করবো আমি?
সায়মা গোঙ্গাচ্ছে। কিছু হয়ত বলতে চাচ্ছে … ওর ব্যাগে হাত দিলাম মোবাইল বের করে ফোন নেওয়ার জন্য। ফোন বের করতেই স্ক্রীনে ভেসে উঠলো ইফতির নাম্বার। আমি তাড়াহুড়ো তে ফোন রিসিভ করতেই ইফতি বলে উঠলো
-সায়মা তুমি এখন আমার বাসায় যেয়ো না …সব প্ল্যান মোতাবেক হচ্ছে কেন সব নষ্ট করতে উঠে পরে লেগেছো?
আমি এপাশ থেকে কোন আওয়াজ করতে পারছিলাম না।
গলা শুকিয়ে আসছিলো।
নিজের কান কে বিশ্বাস দিতে পারছিলাম না। ইফতি ফোনটা কেটে দিলো।
আমার ঠিক সামনে সায়মা মাটিতে পড়ে গোঙ্গাচ্ছে। আমি ওর দিকে একবার তাকালাম এরপর ওর পাশ থেকে উঠে সোফায় গিয়ে বসলাম। সায়মার ফোনে সেই শুরু থেকে একটাই পাসওয়ার্ড সেটা আমার জানা ছিলো সেটা ছিলো ওর জন্মসাল। তাই ফোনের লক খুলতে খুব কষ্ট হয় নি। ফোন এর কল হিস্টোরি থেকে শুরু করে সব কিছুতে ইফতির ম্যাসেজ ,কিছু পার্সোনাল ছবি আরো কত কি!!
আমি গতরাতের ম্যাসেজ পড়ছিলাম ইফতির আর সায়মার।
-বৌ নিয়ে খুব মজা করার প্লান হচ্ছে? আমার আজ জন্মদিন ইফতি তুমি আমাকে রেখে ওর কাছে? তুমি না আমাকে ভালোবাসো কিভাবে কষ্ট দিচ্ছো আমাকে?
-সায়মা সব সময় জীদ ভালো লাগেনা। আমি যা করছি যা করবো সব আমাদের জন্য। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না সুইটহার্ট প্লিজ। আমার প্লান অনুযায়ী আমাকে এগুতে দেও।
আমি বিয়ের শাড়ি দিয়ে চোখ মুছসি আর ম্যাসেজ গুলো পড়ছি। ঐদিকে সায়মার গোঙ্গানী বেড়ে গেলো। কিন্তু আমার তাতে এতটুকুও মনোযোগ নাই।আমার মনোযোগ তখন ম্যাসেজে। আমি যখন অন্য রুমে বৌ সাজতে গিয়েছিলাম তখন ইফতি সায়মার সাথে কথা বলছিলো ম্যাসেজের মাধ্যমে।
-আমি তোমাকে আর এক বিন্দু বিশ্বাস করি না ইফতি । তুমি তনু কে নিয়ে বাইরে গিয়েছো। তাকে সারপ্রাইজ পার্টি দিচ্ছো? বাহ দারুন তোমার ভালোবাসা …
-সায়মা প্লিজ। তুমি শান্ত হউ। কালকের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে প্রমিজ।
-স্ত্রীর সাথে বাসর করে আমার সাথে কি ঠিক করতে চাইছো তুমি?আমি সইতে পারসি না তুমি আজ তনুর সাথে কাটাবে।
-আমি বললাম তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
সারারাত সায়মা হয়ত তার অবৈধ প্রেমিকের সাথে তার বৈধ স্ত্রীর মিলনে ঘুমাতে পারে নি। তাই খুব ভোরে চলে আসলো আমাকে দেখতে।
সায়মার শেষ ম্যাসেজ আমার বাসায় বসে ইফতিকে পাঠিয়েছিলো
-তনুর গায়েও কি আজ আদরের দাগ বসেছে যেমনটা আমার গায়ে বসাও? আমি এসেছি তোমার বাসায় সব দেখতে।
আমার শরীর কাঁপছিলো। আমার সব কিছু ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছিলো।
সায়মার নাক বেয়ে রক্ত পড়ছে ।
হয়ত একটু পানি পান করলে আরাম পেতো। কিন্তু আমআর এতটুকুও মায়া লাগছে না।
আমি খুব আরাম করে আমার শরীরে আধ খোলা বিয়ের শাড়িটা জড়িয়ে সোফায় বসে সে দৃশ্য দেখসি।
সে জায়গাটায় আমার লুটিয়ে থাকার কথা ছিলো। আমার বৈধ স্বামী তার অবৈধ প্রেম ও প্রেমিকার জন্য আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো।
আমার মোবাইল টা ইচ্ছা করেই লুকানো হয়েছিলো যাতে আমি ফোন করে কারো কাছে সাহায্য না চাইতে পারি।
চোখের সামনে ভেসে উঠছে শুরু থেকে শেষ মুহুর্তের সব কিছু।
গতরাতের কথাগুলো।
বাচ্চা নেওয়ার প্লান টাও তাহলে অভিনয়?
আমি কান্না করতে চাইসি চিৎকার করে কিন্তু শক্তি পাচ্ছি না।
সায়মা একটু একটু করে দম ছাড়ছে আমি মনোযোগ দিয়ে দেখসি।
আমার চোখ লাল। সম্পূর্ণ আওয়াজ বিহীন চোখ দিয়ে পানি পড়ছে …
ঠিক তখন ইফতি সায়মার নাম্বারে কল দিলো।
কল টা রিসিভ করলাম আমি।
-সায়মা তুমি কিন্তু আমার বাসায় যেয়ো না। প্লিজ প্লিজ।
-হুশশশসশশশশ
ইফতি সায়মা ঘুমাতে যাচ্ছে। আস্তে কথা বলো। ওর নাক দিয়ে বেরিয়ে পরা রক্ত গুলো তোমার প্রতি আমার অন্ধবিশ্বাসের প্রমাণ দিচ্ছে। তুমি ক্ষীরে চিনির বদলে ভুলে বিষ মিলিয়ে ফেলেছিলে। যেভাবে মিলিয়েছো আমার বিশ্বাসে বিষ।
-তনু কি বলছো এসব? সায়মা কই?
আমি ফোনটা কেটে দিয়ে আবার আগের মত আরাম করে সোফায় বসে সায়মার আধ মরা শরীরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর বললাম
-আস্তে আস্তে মরে যা আমার সামনে। যেভাবে আস্তে আস্তে আমার সংসারে ঢুকে সব আস্তে আস্তে নষ্ট করেছিস ঠিক সেইভাবে… আস্তে আস্তে মরে যা।
সায়মা একটা বড় দম ছেড়ে বিদায় নিল।
ওর বিদায়ের পর ওর চেহারায় ভেসে উঠছিলো ইফতির দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা গুলো।
বিশ্বাস টা একটু বেশিই করেছিলাম।
আমার চোখ বেয়ে শুধু পানি পড়ছে কিন্তু চিৎকার করতে গিয়েও পারছি না।
সায়মার মৃত্যুর সাথে আমার বিশ্বাসের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটলো।
ইফতি সায়মার মোবাইলে ফোন দিয়েই যাচ্ছে।
আমি চোখ মুছে আবার সায়মার দিকে তাকিয়ে আছি পড়নে আমার বিয়ের শাড়িটা যা আধা খোলা আমার শরীরে। আমি সোফায় আর মাটিতে নিথর হয়ে পরে আছে আমার বিশ্বাস ঘাতক স্বামীর অবৈধ প্রেমিকার লাশ।
ভালোবাসা বেঁচে থাকুক শুধু এবইং শুধুই বিশ্বাসে।

লেখিকা : জাকিয়া জুলিয়েট

প্রেম-ভালোবাসার গল্প

জানুয়ারীর এক ঠান্ডা বিকেলের কথা । আমি বসে ছিলাম শহরের নির্জন অংশের ছোট্ট একটা কফিশপে । এক হাতে ছিল এক মগ এক্সপ্রেসো কফি, আরেক হাতে একটা রগরগে চাররঙের ম্যাগাজিন । শীতটা সে বছর একটু বেশিই পড়েছিল, পশমের মোটা পুলওভার, ধোয়া ওঠা এক্সপ্রেসো কফি আর ম্যাগাজিনের পাতার উত্তেজক বিদেশী নায়িকাদের সাংঘাতিক নাভি-পেট বুক কিছুই ওম দিচ্ছিল না । জানুয়ারীর হিম রক্তের ভেতরঢুকে পড়ে পুরো শরীর জুড়ে একধরণের শিরশিরানো অনুভূতি জাগাচ্ছিল ।

এরকম এক শীতের বিকেলে তার সাথে প্রথম পরিচয় । সেও এসেছিল কফি খেতে । বসেছিল আমার ঠিক সামনের টেবিলে । আশ্চর্যের ব্যাপার এত কাছে থাকা এবং যথেষ্ট সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও তারদিকে আমার চোখ পড়েনি ।

সে যখন ধীর পায়ে আমার টেবিলে এসে বলেছিল, ” আপনি খুব চমত্‍কার অভিনয় করেন ।” তখনই আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম । তার মাথাভর্তি ছিল আলুথালু বাদামি রঙের চুল, খাড়া নাক,গভীর গভীর দুটো চোখ, পাতলা ঠোঁট, গায়ে চকোলেট রঙা একটামেয়েদের জ্যাকেট আর গলায় প্যাচানো কাশফুলের মতো শাদা একটা উলের ওড়না ।

আমি কিছুটা থতমত খেয়ে তাকে বসতে বলেছিলাম । বসতে বসতে মিষ্টি এক চিলতে হাসি হেসে সে আবার বলেছিল, “আপনি খুব ভালো থিয়েটার করেন।” ক’দিন আগে স্থানীয় একটা সরকারী কলেজে আমরা একটা নাটক করেছিলাম, এই মেয়ে সম্ভবত ঐকলেজের ছাত্রী । আমি একটু লজ্জার হাসি হেসে বলেছিলাম, “ঐ আর কি ।”

এই ভাবে শুরু হলো… । আমি সেদিন জোর করে তার কফির বিলটা দিয়ে দিয়েছিলাম, আর সে পার্চ থেকে একটা গোলাপী নোটপ্যাড বের করে টুকে নিয়েছিল আমার মোবাইল নাম্বারটা ।
তারপর থেকে মোবাইল ফোনে টুকটাক কথা, এস এম এস, মাঝে মাঝে কফিশপে আড্ডা, তারও পরে, যাহয় আর কি, আমরা প্রেমে পড়ে গেলাম ।

মেয়েদের ক্ষেত্রে একটা অভিযোগ প্রায়ই আনা হয়, তারা নাকি ছেলেদের টাকা-পয়সাটাই আসলে পছন্দ করে । আমিও এরকমই ভাবতাম, কিন্তু ও সামান্য কফি ছাড়া আর কিছুই খেতে চাইতো না, আর এটা ওটা কিনে দিলে তো রীতিমতো ফণা তুলতো, এতে নাকি ওর ইগোতে আঘাত করা হয় । ও পছন্দ করতো হাত ধরাধরি করে রেল লাইন বা নদীর ভেজা পাড় ধরে খালি পায়ে হাঁটতে । আর হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই একটা অবিশ্বাস্য কাজ করত : ইনিয়ে বিনিয়ে আমার চেহারার প্রশংসা করত । প্রথমে পাত্তা দিতাম না, ভাবতাম মজা করছে, কিন্তু আস্তে আস্তে বুঝলাম, কোন এক বিচিত্র কারণে আমার কালো কার্টুনের মতো চেহারাটা ওর মনে ধরে গেছে । বলতে লজ্জা নেই, তারপর থেকে আমি নিজেকে আয়নায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা আরম্ভ করলাম । এবং আশ্চর্যের ব্যাপার ক’দিনের ভেতর প্রথমবারের মতো মনে একটা ক্ষীণ সন্দেহ জাগলো : আমি মনে হয় দেখতে ভালোই ।

সেই থেকে নিজের চেহারার যত্ন আত্তি শুরু করে দিলাম । কসমেটিকের দোকান থেকে ফেসওয়াশ, ফেয়ারনেস ক্রিম, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার কিনে আনলাম । চেহারার সাথে মানানসই দেখে নতুল কায়দায় চুল রেখে দিলাম । দু’দিন পর পর ফোম শেভ করতে লাগলাম ।
আমার মনে হলো, শুধু চেহারা ভালো করলে হবে না সাথে শরীরটাও যুতসই করা দরকার । ভর্তি হয়ে গেলাম শহরের অভিজাত একটা জিমে । পাল্টে ফেললাম দৈনন্দিন খাবারের মেনু । বয়স, উচ্চতা আর ওজনের কথা মাথায় রেখে ক্যালোরি মেপে মেপে খাওয়ার অভ্যাস করলাম ।
একমাসের ভেতর আমার শরীর চেহারা পোশাক আশাকে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসল । কী বলব, নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে গেলাম ।
ওর সাথে ঘুরতে বেরোই, একথা সেকথার পর ও পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বলে,তুমি দিনকে দিন আরো বেশী সুন্দর হচ্ছ । আমি মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়াই আর বাসায় যেয়েঅমনি আয়নার সামনে দাঁড়াই । এইভাবে নিজের প্রতি আমার ভালোবাসা প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে লাগল ।

আরো কিছুদিন পর, যে দিন আমি আবিষ্কার করলাম, পৃথিবীর যে কোন কিছুর চেয়ে আমি আমার যত্নে করা গড়ে তোলা শরীর এবং চেহারাটাকে অনেকগুন বেশী ভালোবাসি, সেদিন ও আচমকা রোড য়্যাক্সিডেন্ট করল । প্রচুর রক্তক্ষরণ হল । ডাক্তার বলল, দ্রুত রক্তের ব্যাবস্থা করুন ।

ওর আর আমার রক্তের গ্রুপ একই, তবুও আমি ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলাম, কোনো ব্লাড ব্যাংকে ঐ গ্রুপের রক্ত আছে কি না, কেননা আমি ততদিনে নিজেকে সবচে’ ভালোবাসতে শিখেছি ।

ভালোবাসার শরীর থেকে কে রক্ত ঝরাতে চায় বলুন?

শেয়ার করুনঃ

কিংবদন্তিতুল্য কীর্তিমান প্রবাদপুরুষ শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার

মো. মুজিবুর রহমান

কিংবদন্তিতুল্য কীর্তিমান প্রবাদপুরুষ শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার অনির্বাণ দীপ শিখায় চির ভাস্বর। সে সঙ্গে তাঁর স্মৃতি সব মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় প্রজ্বলিত মশাল হয়ে জ্বলছে। তাঁর মূলধন ছিল এ দেশের মাটি ও মেহনতি মানুষ। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ছিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের অকৃতিম ভালোবাসা। সাহসে ভর করে নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে ঠিকই এগিয়ে গেছেন তিনি।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার আন্দোলন-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও জনগণের ইতিহাসের মধ্য থেকে উঠে আসা একজন সংগ্রামী মানুষ। তাঁর সংগ্রাম ছিল খেটে খাওয়া মানুষের জন্য। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনতার জন্য তিনি রাজনীতি করেছেন। সাধারণ মানুষকে আপন করে নেয়ার এক দুর্লভ গুণ তাঁর মধ্যে ছিল।

তিনি যেমন সাধারণ মানুষকে সহজে আপন করে নিতে পারতেন, তেমনি সাধারণ মানুষও তাঁকে আপন করে নিয়েছিল। সাধারণ মানুষের অন্তরের মণিকোঠায় তিনি আপন আসন করে নিতে পেরেছিলেন। সেজন্য তাঁর প্রতি মানুষের তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ছিল অপরিমেয়। তাঁর এই ভালবাসা, সারাটা জীবন সৎ থাকা এবং অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার পেছনে তা রাজনৈতিক দর্শন পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শও কাজ করেছে। বিনম্র চরিত্রের এই অসামান্য রাজনীতিক কোনো অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। এদিকে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের পক্ষে তাঁর অসাধারণ ভূমিকার জন্য শহীদ আহসান উল্লাহ সকলের অন্তর ছুঁয়ে আছে।

৯ নভেম্বর ২০১৭, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ৬৭তম জন্মবার্ষিকী অন্যভাবে বললে বলতে হয় ৬৮তম জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তিনি আজ ৬৮ বছরে পা রাখতেন। ১৩ বছর আগে ২০০৪ সালের ৭ মে মাটি ও মেহনতি মানুষের সংগ্রাম-আন্দোলনের পুরোধা আহসান উল্লাহ মাস্টার ঘাতকচক্রের ব্রাশফায়ারে শহীদ হন। তাঁর জন্ম গাজীপুরের সাবেক পূবাইল ইউনিয়নের (গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অধীনে) হায়দরাবাদ গ্রামে। জন্ম তারিখ ৯ নভেম্বর ১৯৫০ সাল। ছাত্রজীবনে তিনি সোচ্চার ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, সত্য প্রতিষ্ঠায় এবং সব প্রগতিশীল আন্দোলনে।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি ছিলেন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক। গত শতকের ষাট দশকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর সম্পর্কে আহসান উল্লাাহ মাস্টারের দ্ব্যর্থহীন উচ্চারণ ছিল-“বঙ্গবন্ধু ছাড়া আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।”

রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সেই যে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বললেন-“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”, আহসান উল্লাাহ মাস্টারের মতো হাজারো কর্মী তাঁদের নেতা বঙ্গবন্ধুর উপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে এগিয়ে গেলেন অবিসংবাদিত নেতার দেখানো পথে, ঐক্যবদ্ধ হলো বাঙালি জাতি। আহসান উল্লাহ মাস্টার জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য অবতীর্ণ হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে গৌরবদীপ্ত সফল ভূমিকা ও অবদান।

সমাজকে বড় করে দেখতে হলে মানুষকে বড় করে দেখতে হবে আর সেই মানুষই বড় সম্মান করে আহসান উল্লাহকে তাঁর নামের সাথে একটি বিশেষণ জুড়ে দিয়েছিল ‘মাস্টার’ । এমনকি এখন তা তাঁর নামের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ’আহসান উল্লাহ মাস্টার।’ তাঁর পেশাপরিচয় ও শিক্ষকতার আদর্শই তাঁর সমগ্র জীবনাচরণের অঙ্কুর ও শেকড়কে ধারণ করেছিল। তাঁর সকল মানবিক গুণ, ধ্যান-পবিত্রতা, কর্তব্য-পরায়ণতা, দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা, সাহসিকতা ও ন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর সমুদয় সত্যনিষ্ঠায় যর্থাথই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরিচয় এবং সম্মানসূচক বিশেষণ।

সত্য সন্ধানের কঠিন সাধনা উপলব্ধি থেকে বলতে পারি শহীদ আহসান উল্লাাহ মাস্টারের ব্যক্তি-সত্তার মধ্যে একজন সমাজদরদী মহান মানুষের চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিকে তরুণ আহসান উল্লাহমাস্টার শুধু যে শ্রম বিষয়ক ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তা নয় তাঁকে আমজনতার দরদী নেতার ভূমিকা পালন করতেও দেখা গেছে। শ্রমিকদের অভাব অভিযোগ নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার করা এবং তাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় কোনদিনই তাঁকে পিছ পা হতে দেখা যায় নি। ধীরে ধীরে মেহনতি মানুষ তাদের এই দরদী নেতার এমন অন্ধ-অনুসারী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যে, তাঁর আহ্বানে দু’তিন ঘন্টার মধ্যে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ হওয়ার বিচিত্র দৃশ্য অবাক-বিস্ময়ে ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুরের সবাই বার বার প্রত্যক্ষ করেছে।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার তাঁর অন্তরের দরদ দিয়ে আমজনতার ভাল-মন্দ খোঁজ খবর নিতেন ও তাঁদের নিয়ে ভাবতেন বলেই তাঁর কথায় মানুষ সাড়া না দিয়ে পারতেন না। আর এভাবেই তিনি শ্রমিক ও জনতার দরদী নেতা রূপে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গেই সমভাবে তিনি মিশতে পারতেন। গরীব-দুঃখীদেরই একজন হয়ে সাধারণ মানুষের সমাজেও তিনি অকৃত্রিমভাবে মেলামেশা করতে পারতেন।

তাঁকে সবাই ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করতেন। বিপন্ন অভাবগ্রস্থ মানুষের জন্য তাঁর অন্তরে সঞ্চিত ছিল সীমাহীন সহানুভূতি ও দরদ; এই জন্যই দেখা গেছে যে, গরীব-দুঃখীদের সহযোগিতার বেলায় তিনি অকৃত্রিম বন্ধু। শ্রম বিষয়ক আন্দোলনে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেই মামলার আইনী লড়াইয়ের জন্য আইনজীবী নিয়োগ ও মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল গঠনসহ বহুবিধ কর্মযজ্ঞের সাথে শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার পরিচিত হয়েছেন।

ঢাকা-টঙ্গী-গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম খুলনাসহ বিভিন্নস্থানের নির্যাতিত ও ভোগান্তির শিকার শ্রমিকদের জন্য মামলা বিষয়ক আইনী লড়াইয়ের জন্য ছুটে যেতেন তিনি নিজে। অসাধারণ বন্ধুপ্রীতি ও অনুগত জনের প্রতি গভীর সৌহার্দ ও অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল শহীদ আহসান উল্লাাহ মাস্টারের অন্যতম গুণ। যাকে একবার তিনি বন্ধু বলে গ্রহণ করেছেন, তার জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে তিনি সর্বক্ষণ প্রস্তুত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তাধারার জীবন জোয়ার সৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে তাকে সুসংহত করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার পথে তিনি ছিলেন- একজন মাঠের দক্ষ কর্মী । তিনি ছিলেন একজন দেশভক্ত প্রেমিক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বিনির্মাণ ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

একজন সম্পূর্ণ মানুষকে আবিস্কার করতে গিয়ে দেখা যাবে শহীদ আহসান উল্লাাহ মাস্টারের ছেলেবেলা অন্য দশজনের ছেলেবেলার মতোই শুরু হয়। শিশু ও শৈশবে নিবিড় পল্লী- প্রকৃতিতে দিন অতিবাহিত করেছেন তিনি। ছয় ভাইবোন, অনেক বন্ধুবান্ধবের কলকাকলি এবং হাতছানির মধ্য দিয়ে দিনগুলো কেটেছে তাঁর।

আহসান উল্লাহমাস্টারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের হায়দরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন। তখন থেকেই টঙ্গীতে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ছাত্রছাত্রী কর্তৃক শরীফ কমিশন রিপোর্ট প্রত্যাখাত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামুদুর রহমানকে প্রধান করে ছাত্র সমস্যা ও ছাত্র কল্যাণ বিষয়ে একটি নতুন কমিশ নিয়োগ করে। এ সকল ক্ষেত্রে ছাত্র আন্দোলন প্রকট রূপ নেয়। রাজপথে নামে ছাত্র-ছাত্রীরা। সে সময়ে টঙ্গীতে যে আন্দোলন হয়েছিল সেই আন্দোলনে স্কুল পড়–য়া ছাত্র আহসান উল্লাহ রাজপথে নেমে পড়েন। অংশগ্রহণ করেন মিছিলে। তখন থেকে ছাত্র লীগের রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। টঙ্গী হাইস্কুল থেকে আহসান উল্লাহ ১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমান শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা যখন রাজপথে, তখনও ভাওয়ালের এই সন্তান আহসান উল্লাহরাজপথের একজন সাহসী সৈনিক। এই রাজনীতির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠতে থাকে। তিনি পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকেন। বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা মিলে আন্দোলন গতি লাভ করে। সে সময়কার উত্তাপ্ত টঙ্গীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে যে সব সভা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সেগুলো আয়োজনে যাঁদের নাম সর্বাগ্রে আসে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তরুণ ছাত্র নেতা আহসান উল্লাহ। সে সময়কার দিনে টঙ্গী, গাছা ও পুবাইল এলাকায় গণআন্দোলনে তিনি অভূতপূর্ব অবদান রাখেন ।

১৯৬৮ সালে তথাকথিত আগরতলা মামলায় বাঙালির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করে। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার নিমিত্তে টঙ্গী-জয়দেবপুরের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন লড়াকু ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ। তিনি কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে ‘মুজিব তহবিল’ এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রয় করে অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য সকল কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৬৮ সালের গণজোয়ারের সৃষ্টিতে অবদান রাখেন।

ছাত্রনেতা আহসান উল্লাহ ১৯৬৯ সালের ছাত্রের ১১ দফার ভিত্তিতে গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রবল গণজোয়ার ও গণঅভ্যুত্থানে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, বাঙালির মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রু ১৯৬৯, শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকায় প্রদত্ত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে টঙ্গী থেকে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সাথে আহসান উল্লাহ যোগদান করেন। দশ লক্ষ লোকের সেই জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া হয়।

শুধু মানুষের ভালবাসা ছিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের সঞ্চয়। আবার ছিল না বৈভব-বিত্ত। এমনি অবস্থায় রুখে দাঁড়িয়েছেন সমাজের যত অন্যায়-অবিচারের বিপক্ষে তিনি সর্বদা। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপোষ করেননি যে ব্যক্তিটি, যিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একজন মানুষ ও রাজনীতিবিদ। সেই ব্যক্তি প্রাণ হারালেন ঘাতকচক্রের হাতে। সেবার দ্বারা ও মহৎ কর্মের মাধ্যমে আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে যে মানুষটি অবদান রেখেছিলেন সংগ্রাম-আন্দোলনে, সে মানুষটি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার প্রমাণ করেছেন মানুষকে ভালবাসলে, তাদের জন্য কাজ করলে ও জীবন উৎসর্গ করলে মানুষ ভালবাসায় তার প্রতিদান দেয়।

জনগণের রায় ছিল শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের পক্ষে সকল সময়। এ কথা বলতে হবে সবাইকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনে যতবার প্রার্থী হয়েছেন আমাদের জনগণের নেতা শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার একটিবারের জন্য হারেননি। জিতেছেন বিপুল ভোটে। জয় করে নিয়েছেন গণ-মানুষের হৃদয় ও অকৃত্রিম ভালবাসা। তিনি ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত হন।

১৯৮৩ সালের পূবাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হবার পর থেকে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার উপজেলা পদ্ধতি বিলোপ করে দেয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপজেলা চেয়ারম্যানদের নিয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টার দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন।

এজন্য তিনি জেল, জুলুম এবং নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। উপজেলা বিলোপের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। তারই বিজয় আজ দেশে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব ফল হিসেবে বিরাজ করছে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন, পেশাগত ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানী বন্ধ করার দাবী নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন প্রতিনিয়ত। দেশে যখন ত্রাস ও গ্রাসের রাজনীতির বলয় তৈরি হয়েছে তখনই শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টারকে দেখা গিয়েছে টঙ্গীর রাজপথে এবং ঢাকার রাজপথে। তিনি ১৯৮৩ সাল, ১৯৮৪ সাল, ১৯৮৭ সাল, ১৯৮৮ সাল ও ১৯৯০ সাল, ১৯৯৫ সাল, ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পটভূমিতে শ্রমজীবী নেতা হিসেবে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা গর্ব করার মতো।

২০০১ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের নিকট রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি বস্ত্র শিল্পের মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে মিলগুলো বেসরকারীকরণে যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনে যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম বাস্তবে কাজে লেগেছে, তিনি হচ্ছেন শ্রমিকদের পরীক্ষিত নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার। শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের প্রশ্নে কোনদিন আপোষ করেননি। শ্রমিক অসন্তোষ যেখানে দেখা দিয়েছে, সেখানেই নিজে ছুটে গিয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষের সময় খেয়াল রেখেছেন শ্রমিক কেউ অসন্তোষকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে নিজের ফয়দা হাসিল না করতে পারে। দর কষাকষির মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন করার নিরন্তর চেষ্টাকে তাঁকে সফল নেতায় পরিণত করেছে। প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে বন্ধ ও রুগ্ন কলকারাখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া, পাটসহ জাতীয শিল্প রক্ষা ও কৃষকদের স্বার্থে কাঁচা পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ শ্রমিক-কৃষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেছেন ভাওয়ালের এই কৃতী সন্তান শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার। তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে ক্ষতিগ্রস্থ শ্রমিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা, নারী শ্রমিক স্বার্থ সম্বলিত দাবী বাস্তবায়ন ও বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে মজুরি ও বেতন-ভাতা নির্ধারণ করার জন্য দেশের নীতিনির্ধারণী মহলের সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত শতকের আশির দশকে গঠিত শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) লক্ষ্য বাস্তবায়ন করার জন্য শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। তিনি আই এল ও কনভেনশন ‘৮৭ ও ‘৯৮ এর ভিত্তিতে শ্রম আইন সংশোধনের দাবি করেছেন।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার যেমন ছিলেন শিক্ষক আবার ছিলেন শিক্ষকদের নেতা। শিক্ষকদের পেশাগত দাবির সমর্থনে রাজপথে ছিলেন তিনি। টঙ্গী-গাজীপুরে বেসরকারী অনেক শিক্ষকের মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও) ভুক্ত করার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।

শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন দশের মধ্যে একক। তাঁকে মানুষ ভক্তি করতো, তিনিও মানুষকে ভক্তি করতেন। স্বাতন্ত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে আর দশজন থেকে তাঁকে পৃথক করা যায় এবং তিনি দীপ্যমান হয়ে উঠেন জ্যোতির্ময় সূর্যের মতো। সকলের প্রিয় শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার ছিলেন সবস্তরের মানুষের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় সিক্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বি জনগণমন অধিনায়ক। দেশ ও মানুষের জন্য তিনি কাজ করেছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন। শহীদ আহসান উল্লাহমাস্টার বহুমুখী প্রতিভা ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এ রকম ব্যক্তিকে বাংলার মাটিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ২০০৪ সালের ৭ মে, শুক্রবার। দেশ হারায় জনগণমননন্দিত অধিনায়ককে, যিনি ছিলেন সহস্র তরুণের আদর্শ, যিনি ছিলেন জনকল্যাণমুখী চিন্তাধারার একজন রাজনীতিবিদ ও একজন মানুষ গড়ার কারিগর। বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহমাস্টার একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় মরেননি; যুদ্ধ করেন দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সেই পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে হত্যা করতে পারেনি। তাঁকে হত্যা করে স্বাধীন এ দেশের মাটিতে ঘাতকচক্র।

মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আজন্ম শহীদ আহসান উল্লা হমাস্টার লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের সংগ্রামী মনন ও আন্তরিক কর্মনিষ্ঠা ইতিহাসের উজ্জ্বলতায় বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জীবন সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে ও আদর্শে সমুজ্জ্বল হয়ে । আর সে কারণেই দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করি তিনি ছিলেন কীর্তিমান প্রবাদপুরুষ, এ ধারাই তিনি হয়েছেন মেহনতি মানুষের অনিবার্য নেতা। আজকের জন্মবার্ষিকীতে সেই কীর্তিমান প্রবাদপুরুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ, গাজীপুর এবং আর্ক্ইাভস ৭১ এর প্রতিষ্ঠাতা। ]

ই-মেইল: muktibang@gmail.com

সারাবাংলা ডট কম ডট বিডি (সারাবাংলা লাইফস্টাইল) -এ প্রকাশিত সকল নিউজ বা লেখা বাংলাদেশের প্রকাশিত বিভিন্ন অনলাইন গনমাধ্যম হতে কপি করা। আমাদের লক্ষ্য সকল খবর আমাদের পাঠকদের কাছে পৌছে দেয়া। কোন লেখা বা খবর এর দায়ভার সারাবাংলা লাইফস্টাইল এর নয়। এই সংবাদ/লেখাটি কপি করা হয়েছে এখান হতে।

জাতীয় কবি ও মহা বিশ্বকবি কাজী নজরুল ইসলাম এর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী ২০১৭ উদযাপন

নজরুল একাডেমী জাতীয় কবি এবং মহা বিশ্বকবি কাজী নজরুল ইসলাম এর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী ২০১৭ উদযাপন উপলক্ষে ২৫, ২৬, ২৭ আগস্ট ২০১৭ খৃষ্টাব্দ / ১০, ১১, ১২ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ / ২, ৩, ৪ জিলহজ¦ ১৪৩৮ হিজরি শুক্র, শনি ও রবিবার তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।

২৫ আগস্ট ২০১৭ শুক্রবার বিকাল ৬:৩০টায় নজরুল একাডেমী মিলনায়তনে আলোচনা ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। সেদিন সন্ধ্যা ৭টায় ‘নজরুল টিভি’র উদ্বোধন করবেন মাননীয় সাধারণ সম্পাদক জনাব মিন্টু রহমান এবং তিনদিনব্যাপী ৪১তম নজরুল মৃত্যুবার্ষিকী ২০১৭এর উদ্বোধনী দিবসের অনুষ্ঠান নজরুল টিভির মাধ্যমে লাইভ দেখানো হবে। উক্ত নজরুল টিভি দেখার জন্য সকলকে নিজ নিজ ফেস বুকে ঢুকে গরহঃঁ জধযসধহ অথবা ঝৎধনড়হ অযসবফ আইডিতে লগ ইন করতে হবে। সকলকে উক্ত অনুষ্ঠান ফেসবুকে দেখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

২৬ আগস্ট ২০১৭ শনিবার নজরুল একাডেমী শাখাসমূহ কর্তৃক রাস্তা, বাস স্ট্য-, রেল স্টেশন, লঞ্চ-ফেরী ঘাট, স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়, হাট-বাজার, শপিংমল ইত্যাদি স্থানে গমন করে সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয় কবি ও মহা বিশ^কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর মর্যাদা ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়।

২৭ আগস্ট ২০১৭ রবিবার কবির মৃত্যুদিবসে সকাল ৭:৩০টায় জাতীয় কবি ও মহা বিশ^কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ করা হয় এবং বাদ জোহর সমাধিসৌধ সংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে পবিত্র মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

ভ্রমনের টুকিটাকি

ভ্রমন বিলাস আর ভোজন বিলাস দুটোই আমাদের মাঝে হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেছে।  রিফ্রেশমেন্টের জন্য এখন আমরা সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে পড়ি কোথাও ঘুরতে।  তবে এই ঘোরাঘুরির আনন্দ যেমন কয়েকগুন বেড়ে যেতে পারে একটু গোছানো প্রস্তুতিতে, তেমনি একটু কেয়ারলেস হলেই আবার আপনার ভ্রমন হয়ে যেতে পারে তিক্ত।  ছোট ছোট কয়েকটি টিপস যেগুলো এড়িয়ে গেলে সহজেই এড়ানো যায় কিন্তু একটু খেয়োল করে কাজগুলো সেরে নিলেই আপনার ভ্রমন হতে পারে আরও আনন্দময় ও আরামদায়ক।  এখানে আরেকটা বিষয় উল্যেখ করা দরকার,

ভ্রমন মানেই কিন্তু আন্দভ্রমন বা পিকনিক নয়।  বন্ধু বা সহকর্মীরা মিলে কক্সবাজার ঘুরতে যাওয়ার জন্য যেমন প্রস্তুতির দরকার আছে তোমনি সারাদিন অফিস করে সাপ্তাহিক ছুটিতে দেশের বাড়ি ফেরার জন্যও প্রস্তুতির দরকার আছে।

১. সানগ্লাস: সানগ্লাস মানেই কিন্তু কিছু স্টাইলিশ ছবি তোলা নয়।  রোদ থেকে বাঁচার জন্য ভ্রমনে সানগ্লাস আপনার প্রধান সহায়ক বস্তু।  ভ্রমনের সময় আপনি বেশিরভাগ সময়ই থাকবেন হোটেল বা গাড়ির বাইরে; এমনকি সেটা ভর দুপুরে বা পিচঢালা রাস্তাও হতে পারে।  সে ক্ষেত্রে রোদ থেকে বাচতে সানগ্লাস এর বিকল্প নেই।

২. পানির বোতল: ব্যাগ ভারী হয়ে যাবে এই ভেবে বাসা থেকে বের হওয়ার সময়  পানির বোতল নিয়ে বের হবেন না এমনটা কিন্তু মোটেই করবেন না।  একবারে সংক্ষিপ্ত ভ্রমনের জন্য হলেও সাথে পানির বোতল নিয়ে বের হওয়া চাই।  সাথে সাপোর্টিং হিসেবে রাখতে পারেন টেস্টি স্যলাইন বা রেডি কফি যা আপনার তাৎক্ষনিক স্ট্যমিনা বাড়াতে কাজ করবে।

৩. ছাতা: বাঙালি বৃষ্টিতে ভিজবে, রিক্সা থেকে দৌড়ে নেমে দোকানে আশ্রয়ের জন্য দাড়াবে কিন্তু মেঘেভরা আকাশ দেখেও বাসা থেকে বেড় হওয়ার সময় ছাতা নিয়ে বের হবে না।  হ্যা, এটাই আমাদের অভ্যাস।  কিন্তু যে কোন ভ্রমনে, আকাশ মেঘলা বা প্রখর রোদ থাকুক আর না থাকুক, ছাতা নিয়ে বের হওয়া অতি জরুরী।

৪. টাকা: ভ্রমনের সময় আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো টাকা।  কথায় আছে “মাথায় বুদ্ধি আর পকেটে টাকা, তো ভ্রমনে আপনিই রাজা। ” প্রয়োজনের অতিরিক্ত খুব বেশি টাকা সঙ্গে না নিলেও প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই টাকা নিয়ে বের হওয়া দরকার ভ্রমনের সময়।  কেননা জরুরী প্রয়োজন বলে-কয়ে আসে না।  ভালো হয় সাথে ডেবিট কার্ড/ক্রেডিটকার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা থাকলে।  তবে যেখানে যাচ্ছেন সেখানে ডেবিট কার্ড/ক্রেডিটকার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা আছে কিন্ সেটাও আপনার জানা থাকতে হবে।

৫. চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, মেমোরি কার্ড: অনেক সাধের ভ্রমন কিন্তু মুহুর্তেই আপনার রঙিন মন চুপসে দিতে পারে “লো ব্যাটারি” সিগনাল।  ভ্রমনে বের হওয়ার আগের ফুল চার্জ দিয়ে নিন মেবাইল, ক্যামেরার ব্যাটারী, পাওয়ার ব্যাংক।  সেলফি তোলার জন্য সাথে নিতে পারেন সেলফি স্টিক।  গ্রপ ট্যুরের ক্ষেত্রে আবার ভ্রমন শেষে ছবি শেয়ারের জন্য সাথে নিতে পারেন পেন ড্রাইভ, ডাটা কেবল, ওটিজি কেবল।  মেমোরি কার্ডে ছবি তোলার জন্য পর্যাপ্ত খালি জ্য়গা, মোবাইলে প্রচুর পরিমান গান, এসব আপনাকে প্রস্তুত করে রাখতে হবে ভ্রমনে বের হওয়ার আগের দিনই।

৬.ব্রাশ, মোজা:  একাধিক দিনের ট্যুর হলে আমরা যে ভুলটা সব থেকে বেশি করি তা হচ্ছে ব্রাশ ফেলে বের হই।  রাস্তায় কিনে নেওয়ার প্ল্যান থাকলেও সেটা মনে থাকে না; মনে পড়ে দিন শেষে ঘুমানোর আগে বা সকালে ঘুম থেকে উঠে।  তাই ভ্রমনে বের হওয়ার আগের দিনই ব্যাগে ভরে রাখুন ব্রাশ।  টানা কয়েকদিনের ট্যুর হলে সাথে নিন কয়েক সেট নতুন/ধোয়া মোজা।

এসব গেলো কিছু কমন প্রস্তুতি।   এছাড়াও ভ্রমনের স্থান ও সময়ভেদে নেওয়া লাগতে বিভিন্ন বাড়তি কিছু প্রস্তুতি।  তবে ভ্রমনে যেখানেই বের হবেন সাথে রাখবেন যেকোন ধরনের আইড কার্ড ও জরুরী যোগাযোগের কিছু ফোন নম্বর।  সবার ভ্রমন সুন্দর হোক।

কালো যাদু – একখন্ডে সমাপ্ত সম্পূর্ণ পিশাচ কাহিনী

সব কাজ সবার দ্বারা সম্ভব না।’, তীব্র আপত্তির সুরে বললেন আহসান সাহেব।
আহসান সাহেব তপুর বড় চাচা। রাজশাহী শহরের একজন শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। রাজশাহী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি পড়াশুনা করেছেন কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে রীতিমত গবেষণা করেছেন আর সে বিষয়টা হল ব্লাক ম্যাজিক বা কালো যাদু। ব্লাক ম্যাজিকের উপর তিনি প্রচুর পড়াশুনা করেছেন, রাতের পর রাত কাটিয়েছেন শ্মশানঘাট আর কবরস্থানে। এমনকি হাতে কলমে ব্লাক ম্যাজিক শেখার জন্য তিনি বেশ কিছুদিন কাটিয়ে এসেছেন আফ্রিকায়, শিখেছেন সেখানকার ভয়ংকর সব কালো বিদ্যা, যার আফ্রিকান স্থানীয় নাম হল ভূডু।
তপু আহসান সাহেবের ছোট ভাইয়ের ছেলে। রাজশাহী কলেজের ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। প্রচণ্ড ভালবাসেন তিনি তপুকে। তপুর প্রত্যেকটা আব্দার তিনি পূরণ করেন, কোন কিছুতেই না করেন না। কিন্তু যখন তপু বলল, সে ব্লাক ম্যাজিক শিখতে চায়, তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, তপুর পক্ষে এটা সম্ভব নয়।
‘কেন সম্ভব না, তুমি পারলে আমি কেন পারব না?’, বলল তপু।
‘দেখ তপু, ব্লাক ম্যাজিক ছেলেখেলা না, পদে পদে এখানে বিপদের আশঙ্কা থাকে।’
‘থাকুক, তবুও আমি শিখব।’ একগুঁয়ের মত জবাব দিল তপু।
‘আমি তোকে শিখাবো না’ বড় চাচাও কম যাননা।
‘চাচা প্লিজ, আমি ঠিক পারব। দেখো কোন বিপদ হবে না।’
‘তপু, তোকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি, তোর দ্বারা এসব সম্ভব না। প্রচণ্ড সাহস লাগে এতে। সাহস না থাকলে ব্লাক ম্যাজিকের প্রথম স্তরটাই পার হওয়া যায় না।’
‘কিন্তু আমি পারব। সাহস আমিও কম রাখিনা।’ তীব্র জেদের সাথে উত্তর দিল তপু।
‘হ্যা, জানি তোর সাহস কতদূর। কদিন আগেও তো নিজের ছায়া দেখে ভয় পাতিস।’
‘সে তো বহুদিন আগের কথা, তখন তো আমি এক্কেবারে ছোট ছিলাম। ওসব কথা বাদ দাওতো, তুমি শিখাবে কিনা বলো।’
‘ না’ এক কথায় উত্তর দেন আহসান সাহেব।
‘চাচা প্লিজ, খালি একটা সুযোগ দাও। দেখো, আমি ঠিক পারব। যদি না পারি, তাহলে আর কখনও তোমাকে জ্বালাবো না। শুধু একটা সুযোগ দাও।’ অনুনয় ঝরে পরল তপুর কন্ঠ থেকে।

‘ কিন্তু …….’
‘প্লিজ চাচা, প্লিজ’
কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন ভাবলেন আহসান সাহেব।
‘ঠিক আছে, কিন্তু মনে রাখিস একটাই মাত্র সুযোগ পাবি তুই। একটা ছোট পরীক্ষা হবে, যদি উত্তীর্ণ না হতে পারিস তাহলে আর কখনও ব্লাক ম্যাজিকের নাম মুখেও আনতে পারবিনা, ঠিক আছে?’ বললেন আহসান সাহেব।
‘রাজি,’ আনন্দে সব কটা দাঁত বের করে হাসল তপু।
‘আজ পঁচিশ তারিখ। পরশুদিন অর্থাৎ সাতাশ তারিখ অমাবস্যার রাত। পরশুদিন ঠিক রাত বারটার সময় একটা মাটির হাড়ি, এক সের আতপ চাল আর বিশটা দাঁতন নিয়ে কাদেরগঞ্জ কবরস্থানের ভিতরে ঢুকে যাবি। সোজা কিছুক্ষণ চলার পর অনেক পুরনো একটা বটগাছ দেখতে পাবি। বটগাছটার ডান পাশ দিয়ে একটা ছোট রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তা দিয়ে একেবারে সোজা চলে যাবি। সেই রাস্তার একেবারে শেষ মাথায় দেখবি অনেক পুরনো একটা ভাঙ্গা কবর আছে। কবরটার পাশে একখণ্ড ফাঁকা মাঠ আছে। ঐ মাঠের মাঝখানে ছোট একটা চুলা খুঁড়বি, তারপর দাঁতন দিয়ে চুলাটায় আগুন ধরিয়ে হাঁড়িতে চাল আর পানি দিয়ে ভাত চড়িয়ে দিবি। চাল ফুটে ভাত না হওয়া পর্যন্ত একটা করে দাঁতন দিয়ে চুলায় জ্বাল দিতে থাকবি। ভাত হয়ে গেলে হাঁড়িশুদ্ধ ভাত নিয়ে সোজা আমার কাছে চলে আসবি। যদি এই কাজটা করতে পারিস তাহলে আমি আর কোন বাঁধা দেবনা, পরশু থেকেই তোর ব্লাক ম্যাজিকের দীক্ষা শুরু হবে।’ বললেন আহসান সাহেব।
‘ব্যাস এইটুকুই?’, একটু অবাকই হল তপু, ‘আমি তো ভেবেছিলাম খুব কঠিন কোন পরীক্ষা হবে। ঠিক আছে চাচা, ভেবে নাও আমি পরীক্ষায় পাশ করে গেছি।’
‘একটা ব্যাপারে তোকে সাবধান করে দেই তপু, ভাত রান্না করার সময় হয়তো আশেপাশে অনেক রকম শব্দ শুনতে পাবি, হয়তো শুনবি কেউ তোর নাম ধরে ডাকছে কিংবা কেউ হয়তো সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে, খবরদার সেই ডাকে সাড়া দিবিনা, খবরদার। আসলে আমি নিজেও জানিনা ওখানে কি ঘটবে, শুধু বলে রাখছি, সবসময় সাবধান থাকবি’ সাবধান করলেন আহসান সাহেব।
চাচার দিকে তাকিয়ে থাকল তপু। ঠিক বুঝতে পারল না, চাচা তাকে ভয় দেখাচ্ছে না সত্যিই সাবধান করছে তবে যাই হোক না কেন সে ভয় পাবে না, এই পরীক্ষায় তাকে পাশ করতেই হবে।

সাতাশ তারিখ রাত পৌনে এগারটা বাজতে না বাজতেই তপু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে কাদেরগঞ্জ কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। তপুদের বাসা থেকে কাদেরগঞ্জ কবরস্থানে রিকশায় যেতে সময় লাগে প্রায় এক ঘন্টা। ঠিক পৌনে বারোটায় তপু কবরস্থানের গেটে পৌঁছে গেল। এতক্ষণ প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস থাকলেও, কবরস্থানের ভয়াবহ নিস্তব্ধতা তপুর আত্মবিশ্বাসকে অনেকটা দমিয়ে দিল। দুরুদুরু বুকে কবরস্থানের গেটে আস্তে ধাক্কা দিল তপু। প্রায় নিঃশব্দেই খুলে গেল গেটটা। কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা সামনের দিকে হাটা দিল তপু। চাচার নির্দেশমতো কিছুক্ষণ চলার পরে অবশেষে ভাঙা কবরটার পাশের ফাঁকা মাঠটা খুঁজে পেল। মাঠটার মাঝখানে ছোট্ট একটা চুলা খুঁড়ল। এরপর চারটা দাঁতন একসঙ্গে ধরিয়ে চুলায় আগুন জ্বালাল। হাঁড়িতে চাল আর পানি দিয়ে চুলার উপর চড়িয়ে দিল। এরপর একটা একটা করে চুলায় দাঁতন দিতে থাকল তপু। সময় যেন খুব ধীরে কাটতে লাগল। তেরটা দাঁতন শেষ, ভাত ফুটতে আর খুব বেশি দেরি নাই। কোথায় যেন একটা কুকুর ডেকে উঠল। অকারণেই শরীরটা একটু ছমছম করে উঠল তপুর। হঠাৎ খেয়াল করল, ওর থেকে বড়জোর সাত-আট হাত দূরে একজন মহিলা বসে একটা চুলা খুঁড়ছে। কোলে একটা বাচচা। ঘোমটা দিয়ে ঢেকে রাখার কারণে মহিলার চেহারা দেখতে পারলনা তপু। অবাক হয়ে তপু দেখল, ওই মহিলাটাও ঠিক তারই মত করে দাঁতন দিয়ে চুলা জ্বালিয়ে ভাত রাঁধতে লাগল। আশ্চর্য, পাশে যে একজন লোক বসে আছে তা যেন মহিলাটা দেখেইনি। আপন মনে একটা একটা দাঁতন দিয়ে চুলায় জ্বাল দিতে থাকল। তপু ঠিক বুঝতে পারেনা, ওই মহিলাও কি তপুর মত কালো যাদু শিখতে চায়? কেন? নিজের কাজ ফেলে সম্মোহনী দৃষ্টিতে মহিলার কাজ দেখতে থাকে তপু।
দেখতে দেখতে মহিলার দাঁতন শেষ হয়ে আসল। চুলার চারদিকে হাত বুলাল কিন্তু জ্বালানোর মত আর কিছু না পেয়ে শেষে নিজের কোল থেকে বাচচাটাকে তুলে নিয়ে চুলার ভিতরে ছুড়ে মারল। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছেনা তপু। আর একটু হলেই চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল এই নৃশংস দৃশ্য দেখে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নিল। ওদিকে মহিলার চুলার আগুন আবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আবার মহিলাটা চুলার চারপাশে জ্বালানীর জন্য হাত বুলাল, কিন্তু কিছুই পেল না। হঠাৎ মহিলাটা খ্যাঁনখ্যাঁনে গলায় বলে উঠল, ” দাঁতন পুড়ে শেষ হল, ভাত ফুটল না। নিজের বাচচাটাকে পুড়িয়ে ফেললাম, তাও ভাত হলনা। এইবার ওই মিনসেটাকে পুড়িয়ে ভাত ফোটাবো,” বলে একটানে নিজের ঘোমটাটা খুলে ফেলে তপুর দিকে ঘুরে তাকাল।
মহিলাটা তপুর দিকে তাকাতেই ভয়ের একটা শীতল শিহরন বয়ে গেল তপুর শরীর বেয়ে। কোথায় মহিলা, একটা পিশাচীনি ভয়ংকর চোখে তাকিয়ে আছে তপুর দিকে। মুখ থেকে মাংস পচে গলে পড়ছে, চোখের জায়গায় দুটো শুন্য কোটর ভয়ংকর ভাবে তাকিয়ে আছে তপুর দিকে। আবার খ্যাঁনখ্যাঁনে কন্ঠে বলে উঠল পিশাচীটা, ” আয়, আমার কাছে আয়। আয় মিনসে, আজ তোকে দিয়েই আমার সাধনা শেষ করব।” বলে শাড়ির ভিতর থেকে একটা লোমশ কুৎসিত হাত বের করে তপুর দিকে বাড়িয়ে দিল পিশাচীটা।

পরদিন। কাদেরগঞ্জ কবরস্থানের গেটের ঠিক সামনে এসে একটা গাড়ি থামল। গাড়ির দরজা খুলে আহসান সাহেব বের হয়ে আসলেন। কবরস্থানের গেট খুলে সোজা পথ ধরে হেঁটে গেলেন। বটগাছটার সামনে যেতেই দেখতে পেলেন অচেতন তপুকে। একটু হাসলেন তিনি। তপুকে ঘাড়ে করে তুলে নিয়ে গাড়ির পিছনের সিটে শুইয়ে দিলেন তারপর গাড়ি ছুটালেন সোজা বাড়ির দিকে।

‘সব কাজ সবার দ্বারা সম্ভব না।’, বিড়বিড় করে বলে উঠলেন তিনি।

শিল্পী আবদুল জব্বারের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠশিল্পী, একুশে পদক  ও স্বাধীনতা পদক পাওয়া শিল্পী আবদুল জব্বার গুরুতর অসুস্থ। তার অবস্থা এখন সংকটাপন্ন।জানা গেছে, ৭৯ বছর বয়সী এ শিল্পী সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা করাতে চান। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

কিডনি, হার্ট, প্রস্টেটসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আব্দুল জব্বার। বিদেশে তার উন্নত চিকিৎসায় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছে শিল্পীর পরিবার।

এরই মধ্যে গুণী এই শিল্পীর চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন সরকার। তার চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয়েছে ২০ লাখ টাকা। পাশে দাঁড়িয়েছেন আরও অনেকেই। কিন্তু আবদুল জব্বারের উন্নত চিকিৎসার জন্য দরকার আরও অর্থ। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা করাতে চান তিনি। এ জন্য আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন আবদুল জব্বার ও তার পরিবার।

হৃদরোগ, কিডনি ও প্রস্টেটসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই শিল্পী আবারও সুস্থ হবেন, এমনটাই মনে করছে তার পরিবার।

আবদুল জব্বার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে কলকাতার বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ধুদ্ধ করেছেন। সেই দুঃসময়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেয়েছেন অনেক গান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এই শিল্পীর গাওয়া বিভিন্ন গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ও মনোবল বাড়িয়েছে। গান গেয়ে পাওয়া ১২ লাখ টাকা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন।

আবদুল জব্বার ‘তুমি কি দেখেছো কভু’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘পিচঢালা এই পথটারে’সহ কিছু কালজয়ী গানে কণ্ঠ দিয়ে সব শ্রেনীর শ্রোতাদের মন জয় করেছেন।

 

স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী সুব্রত সেনগুপ্ত আর নেই

প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী সুব্রত সেনগুপ্ত মারা গেছেন।

আজ মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুব্রত মৃত্যুবরণ করেন।

এই শিল্পীর স্ত্রী জলি সেনগুপ্ত এনটিভি অনলাইনকে বিষয়টি জানিয়েছেন।

জলি সেনগুপ্ত বলেন, ‘ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ফোন আসে, তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। পরে সাড়ে ৬টার দিকে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’ তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে পোস্তগোলা মহাশ্মশানে। সেখানেই সুব্রতর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

গত ৬ মে সুব্রতকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নিউরোসার্জারি বিশেষজ্ঞ আনোয়ার উল্লাহ ও আবুল খায়েরের অধীনে স্বাধীন বাংলা বেতারের এই শিল্পী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের ক্যানসার তখন ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে স্পাইনাল কর্ড, ব্ক্ষ, মেডিসিন, নিউরো, ইউরোলজি সমস্যাসহ শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। সর্বশেষ এই শিল্পী বেশ কিছুদিন ধরে রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি ছিলেন।

জলি সেনগুপ্ত জানান, ২০১৩ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সুব্রত সেনগুপ্ত শয্যাশায়ী। এর পর বিভিন্ন দফায় হাসপাতালে ভর্তি হলেও ‘টাকার অভাবে’ উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি তিনি।

‘রক্ত চাই রক্ত চাই, অত্যাচারীর রক্ত চাই’, ‘ছুটরে সবাই বাঁধ ভাঙা অগণিত গ্রাম মজুর কিষাণ’, ‘শোন জনতা গণ জনতা’সহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মুক্তিযুদ্ধের অনেক গান রচনা করেছেন শিল্পী সুব্রত সেনগুপ্ত। গীতিকার সুব্রত একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে ১৬০টি গান আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ৫৫৫টি গান রচনা করেছেন বলে জানান তাঁর স্ত্রী জলি।

স্বদেশি আন্দোলনের নেতা সুধীর সেনগুপ্তের ছেলে সুব্রত সেনগুপ্ত। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তাঁর মাসি।

সুব্রত-জলি সেনগুপ্ত দম্পতির দুই ছেলে শুভদীপ সেনগুপ্ত ও সংগীত সেনগুপ্ত দুজনই স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত।

গল্প : মেক-আপ করা বৃষ্টি — রুহুল আমীন রাজু

মোহাম্মদ মতিউর রহমান। সবাই ডাকে মতি স্যার বলে। একটি বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মতি স্যারের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও বর্তমানে দু’টি সমস্যা তাকে ভয়ানক কষ্ট দিচ্ছে। একটি হচ্ছে- সেদিন দশম শ্রেনীর ছাত্র/ছাত্রীদের নদী বিষয়ে রচনা লেখার অবস্থা দেখে তিনি দারুন মর্মাহত। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ’ই লিখেছে- ’বাংলাদেশ একটি নদী মার্তৃক দেশ। মাঝি নৌকায় পাল তোলে ভাটিয়ালি গান গেয়ে ছুটে চলে গ্রাম থেকে শহরে…..’

মতি স্যার স্থানীয় আড়িয়ালখাঁ-ѓমপুত্রসহ তিন দিনের ছুটি নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি নদী সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখেছেন, নৌকায় কোনো পাল নেই। সব নৌকা ইঞ্জিন চালিত। এমন বিকট ভট ভট শব্দের মাঝে মাঝির গান শুনলো শিক্ষার্থীরা কোথায় থেকে…? তাও আবার বর্ষাকালে এখন আর মাঝির ভাটিয়ালি গান নয়; নৌকার ভটভটি সঙ্গীত… এরপরতো শুধু’ই নদীগুলো ধূ ধু বালুচর। অথচ ওরা এসব কি কাল্পনিক কথা লিখেছে.. ?

মতি স্যার সকল শিক্ষাত্রীকে এই নদী রচনায় শূণ্য নম্বর দিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে অভিভাবক মহল ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বর্তমান এমপি মোখলেস ভ’ইয়া খবরটি শুনে সাংঘাতিকভাবে ক্ষেপে গেছেন। তার ছোট ছেলেও এই শূণ্য প্রাপ্তির দলে। এমপি সাহেব শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে জরুরী বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে – প্রাইভেট প্র্যাক্টিস, ছাত্র/ছাত্রীদের দিয়ে স্কুলের কাজ করানো… ইত্যাদি।

তবে শূণ্য নম্বর প্রাপ্তিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনো ক্ষোভ নেই, দুঃখও নেই। ওরা সবাই শূণ্য পেয়েছে ফার্ষ্টবয়সহ- বিষয়টি নিয়ে এক প্রকার আনন্দ উল্লাস করছে তারা।

অপরদিকে মতি স্যারের দ্বিতীয় সমস্যাটা হচ্ছে, উনার ছোট ছেলেটা গরুর গোস্ত দিয়ে ভ’না খিচুরি খাওয়ার বায়না ধরেছে। পাশের বাড়িতে বৃষ্টি আসলেই খিচুরি খাওয়ার ধুম পড়ে। ওদের বাড়িতে বৃষ্টির দিন মানেই- খিচুরি খাওয়ার দিন। কিন্তুু মতি স্যার চার’শ আশি টাকায় এক কেজি গরুর গোস্ত ক্রয় করার মতো এতো টাকা যোগাড় করতে অপারগ। মাস আসতে আরো বেশ বাকী। স›ধ্যায় স্কুল ঘরে যে টিউশনি করেন, তাতে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ফি নেন না। মাস শেষে কেউ একটা লাউ মিষ্টি কুমড়া কচু আবার কেউ কেউ কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে থাকে। ইদানীং শূণ্য নম্বর দেওয়ার পর টাকা-পয়সাতো দূরের কথা, লাউ কুমড়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তুু মতি স্যার তাদের পড়ানো বন্ধ করেন নি। বরং মূল কøাস এবং প্রাইভেটে লেখাপড়া আরো জোড়দার করেছেন।

ঘরে ফিরলেই ছেলেটির প্রশ্ন- খিচুরির কি খবর বাজান..? গোস্ত কই..? চাইল- ডাইল কই..? ছেলের এই প্রশ্ন এড়াতে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেন তিনি। ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ার পর এক পরাজিত সৈনিকের মতো ঘরে ঢুকেন তিনি। তার ċী রাবেয়া বেগমের মুখে শুনেন ছেলেটির খিচুরি খিচুরি করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ার গল্প..।

একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মতি স্যার বলেন, এইতো আর ক’টা দিন- বেতনটা পেলেই খিচুরির আয়োজন করা হবে। ঐদিন মেয়ে দুইটারেও জামাইসহ দাওয়াত দিও রতনের মা।

রাবেয়া বেগম চাপা কষ্ট কন্ঠে বলেন, হ আপনে যহন বেতন পাইবাইন তহন আর বর্ষা থাকতো না। আপনের পোলা বৃষ্টির মইধ্যে খিচুরি খাইবো- লইদের মইধ্যে না।

:- আরে বৃষ্টি নিয়া চিন্তা কইরো না রাবেয়া। আবহাওয়া এখন আর আগের মতো নাই। দেখবা বৃষ্টি ঠিকই থাকবো। শোনো- জলবায়ুর প্রভাবে বিশ্ব এখন…..

:- রাহুইন আপনের কেলাস। মাষ্টরি করতে করতে অহন ঘরটারেও ইসকুল মনে করতাছুইন, খিচুরি লইয়া কেলাস শুরু অইছে। এই লইন কানের দোল , এইডা বেইচ্চা চাইল ডাইল গোস সব লইয়া আইয়্যুন।
:- এইডা তুমি কি কইলা ?
:- কেরে আমি কি হিন্দিতে কইছি ? জানুইন না কানের একটা দোল হেই কবেঅই হারাইয়া গেছে। এক কানো কেউ কি আর দোল পিন্দে ? নেইন এইডা বেইচ্চা পোলারে খিচুরি খাওয়াইন আর চালের দুইডা টিন বদলাইন। ট্যাহা কিছু বাড়লে আফনের লাইগগা একটা নীল পাঞ্জাবী কিনুইনযে।
মতি স্যার কাঁপা কাঁপা হাতে রাবেয়ার কানের দোলটা নিলেন। বিয়ের দোল। তার মায়ের দেওয়া দোল। একটা দোল সেই কবে হারিয়ে গিয়েছিলো। হুবহু আরেকটা দোল বানিয়ে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন । আজো পারেননি। কিন্তু মায়ের দেওয়া এই দোল কিভাবে হাত ছাড়া করবেন তিনি..? দোলটাতে যে অনেক স্মৃতি……..

এমপি সাহেব স্কুলে আসছেন। পুলিশের গাড়ীর কু কু শব্দ শোনা যাচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য অভিভাবক ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সবাই উপস্থিত হয়েছেন স্কুলের মাঠে। এমপি সাহেব পাঁচ মিনিট ধরে বসে আছেন। প্রধান শিক্ষক মতি স্যার এখনো বৈঠক স্হলে আসেননি। তিনি নদী রচনাটি কিভাবে বাস্তব ভিত্তিক লিখতে হবে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে কথা বলছেন। অপরদিকে ক্লাস ছেড়ে দিয়ে সকল শিক্ষক/শিক্ষিকারা এমপির সামনে গিয়ে হাজির। কচি ডাবের পানি লেবুর শরবত বেনসন সিগারেট দিয়ে এমপি সাহেব ও তার সফর সঙ্গীদের আপ্যায়নে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

মতি স্যার বৈঠকে উপস্থিত হওয়া মাত্র’ই ইউপি মেম্বার নিয়ামত আলী চড়া গলায় বললেন, কি মাষ্টর সাব এমপি ছ্যার হেই কোন সময় আইয়া বইয়া রইছে আর আপনে পলাইয়া আইছলাইন নাকি ?

মতি স্যার ধরাজ গলায় বললেন, সংযত ভাষায় কথা বলুন মেম্বার সাহেব। আমি পালাবো কেন ? আমি কেলাস নিচ্ছিলাম।
মেম্বার এবার বেশ চেঁচিয়ে বললেন, এমপি ছ্যার বড় না কেলাস বড় ??

:- আমার কাছে কেলাস বড়।
এমপি সাহেব বললেন, বেশ তাই যদি হয় – তাহলে নদী রচনায় সকল ছাত্র/ছাত্রীরা শূণ্য পেলো কেনো ?
:- স্যার,ওরা রচনাটি ভুল লিখেছে। তাই আমি শূণ্য দিতে বাধ্য হয়েছি।
:- ওরা কি বই থেকে লেখেনি ?
:- জি¦ স্যার বই থেকেই লিখেছে। বইয়ে রচনাটি সম্পূর্ণ ভুল।
:- দেশের বড় বড় পন্ডিত আর ডক্টর ডিগ্রিধারী ব্যক্তিগন এই বই লিখেছেন। আপনি বলছেন উনারা ভুল লিখেছেন !! আপনার কি মাথা নষ্ট হইয়া গেছে ?
:- মাফ করবেন, আমার মাথা ঠিক’ই আছে স্যার।
:- মাথা যদি ঠিক থাকে, তাহলেতো দেখছি আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী। জানেন মতি সাহেব রাষ্ট্রদ্রোহীর শাস্তি কি ভয়াবহ ?
:- জানি স্যার। কিন্তুু আমি রাষ্ট্রদোহীতার মতো কোনো কাজ করিনি। রচনাটি ভুল ছিলো- আমি তা সংশোধনী করে দিয়েছি। এছাড়া নবম শ্রেনীর অংক বইয়েও একটা হাস্যকর ও নিন্দাজনক অংক ছিলো, যা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । তৈলাক্ত পিচ্ছিল বাঁেশ এক বানরের ওঠা নামা নিয়ে … আমি এই বানরের লাফালাফি অংকটার স্থলে অন্য একটা কিছু সংযোজনের দাবি জানাচ্ছি। বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হচ্ছে… এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ঘটনাটি দিয়ে অংক করার জন্য আপনার কাছে জোড় দাবি জানাইতেছি। সামনের অধিবেশনে বিষয়গুলি জাতীয় সংসদে তুলবেন মাননীয় এমপি সাহেব।

:- বানরের লাফালাফি..না ? ষ্টপ ষ্টপ ইউর মাউথ । স্যাটেলাইট নিয়া অংক..? সরকারের শিক্ষানীতির উপর বিরুদ্ধচারন… কত বড় সাহস, আমার সাথে বেয়াদবি ! কড়া একটা ধমক দিলেন এমপি সাহেব।

সাথে সাথে চারদিক থেকে হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো। বিশেষ করে এমপি সাহেবের লোকজন মতি স্যারের বরখাস্ত চায়লো এবং এখনি করতে হবে। এই হট্্রগোলের মাঝে কে যেনো ছড়িয়ে দিলো- মতি স্যার সরকার বিরোধী শুধু না ; ইসলামও বিরোধী। মসজিদের মাইকে বিষয়টি ঘোষণা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষের কানে এই খবর পৌঁছার পর স্কুল মাঠ এখন লোকে লোকারণ্য।
মতি স্যারকে এমপি সাহেব দশবার কান ধরে উঠবোস করার জন্য নির্দেশ দিলেন। মতি স্যার অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললেন, আমাকে গুলি করে মেরে ফেলুন। কিন্তুু কানে ধরে উঠবোস করবো না। আমি শিক্ষক, কানে ধরে উঠবোস আমি অন্যকে করাই।
এমপি সাহেব মতি স্যারের গালে মারলেন কষে এক থাপ্পর। মূহুর্তে’ই তার গালে পাঁচ আঙ্গুলের চিহ্ন এঁকে গেলো। মতি স্যার বরফ জমা পাথর হয়ে গেলেন। বাকরুদ্ধ.. যেনো রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তার। ত্রিশ বছরের আলোর বার্তিকা বাহক মতি স্যার আজ পাথর। হাজার পাওয়ারের চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসছে… তিনি অবাক হয়ে ভাবছেন, একজন আইন প্রণেতা সাংসদ সবার সামনে এমন নগ্ন ঘৃণ্য আচরণ কি ভাবে করতে পারলেন… ? এই নগ্নতার বিচার কি এই দেশে হবে…? এক খন্ড কাপড়ের অভাবে কোনো দরিদ্র নারী যখন অর্ধনগ্ন ভাবে রাস্তায় হাঁটে, তখন ইজ্জত যায় না। একজন ফ্যাশন সচেতন নারী যদি রাস্তায় হাঁটে , তখন ইজ্জত যায়।

মতি স্যারের মতো আকাশের һপও হঠাৎ পাল্টে গেলো। আকাশে কালো মেঘের ভেলা। টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো। মতি স্যার বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। রাস্তার পাশে চোখ পড়লো কসাইখানার দিকে। গরুর রান ঝুলছে। এ দেখে মনে পড়ে গেলো তার ছেলেটার খিচুরি খাওয়ার কথা…।

বাড়ি পৌঁছার পর ছেলেটি আজ খিচুরির বায়না করেনি। বাবার গালে হাত বুলিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো. বাজান তোমার গালো যেই ব্যাডা চড় মারছে আমি বড় অইয়া তার গালোও একটা চড় মারাম বলেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। পাশে দাঁড়ানো রাবেয়া বেগম মুখে শাড়ীর আঁচল গুজে নিঃশব্দে কাঁদছে। মতি স্যার বুঝতে পারছেন না এতো তাড়াতাড়ি এ খবর বাড়ী পৌঁছলো কি ভাবে ?

মোবাইল ফোনে দৃশ্যটি ধারণ করে কে যেনো ফেইসবুকে ছেড়ে দিয়েছে। সামাজিক এই মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ প্রচার হচ্ছে।

পরের দিন সব পত্রিকার শিরোনাম- ’ এবার শিক্ষককে প্রকাশ্যে চড় মারলেন এমপি’। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণ বিচারের দাবিতে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। চলছে মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ। শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের গালে চড় মেরে অভিনব এক প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

মতি স্যার এখন কেবলি পাথর। পাথর মানুষ। শুয়ে আছেতো আছে’ই, বসে আছেতো আছে’ই। বাইরে অঝর ধারায় বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দগুলো তার কাছে একটি ধ্বনি’ই উচ্চারিত হচ্ছে- ’খিচুরি’। ছেলেটাকে কি ভাবে গরুর গোস্ত দিয়ে খিচুরি খাওয়ানো যায় … কিন্ত, তার ছেলে পাঁচ বছর বয়সের রতন ভুলে গেছে খিচুরি বিষয়টি। ওর মাথায় এখন একটি বিষয়’ই বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে- কবে সে বড় হবে.. বাবার গালে যে চড় মেরেছে, তার গালেও একটা চড় মারার…

মতি স্যারের বাড়িতে সহমর্মিতা জানাতে প্রতিদিন ছুটে আসছে শ’ শ’ শিক্ষার্থী। যারা শূণ্য পেয়েছিলো তারাও স্কুলে যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে দল বেঁধে তাকে দেখে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে জাতীয় সংসদ সদস্য মোখলেস ভ’ইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ’ঘটনাটি সম্পূর্ন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত। ঐদিন এ ধরনের কোনো ঘটনা’ই ঘটেনি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতীক মহল আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বীত হয়ে ঘটনাটি সাজিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করেছে।’ এমপি সাহেবের এ বক্তব্যে দেশের মানুষ আরো প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে।
মতি স্যারের সাবেক ছাত্র/ছাত্রীরা ফেইসবুকে সামনের শুক্রবারে ঐ স্কুল মাঠে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করার ষ্ট্যাটাস দিয়েছে। এতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।

স্কুলের মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ন হয়ে গেছে। মতি স্যারকে মঞ্চে চেয়ারে বসিয়ে শুরু হলো জ¦ালাময়ী বক্তৃতা। তিনদিনের মধ্যে এমপি মোখলেস সাহেবকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে, নতুবা সংসদ ভবন ঘেরাও করার কর্মসূচী ঘোষণা করেছে তারা। এছাড়া ছাত্ররা সবাই মিলে সাহসী মতি স্যারকে এক ভরি ওজনের একটি সোনার মেডেল উপহার দিয়েছে। এরই মাঝে এক ছাত্র বর্তমানে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ও গীতিকার মতি স্যারকে নিয়ে একটি গান লিখেছে। গানটি গাওয়ার জন্য বাদ্যযন্ত্র আনা হয়েছে । গানটি সে নিজেই গাইছে –

লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখা পড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো গািড় নাই ।।
কাঠ ফাটা রোদ্রে ছেঁড়া ছাতা মাথায়
মতি স্যার পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখাপড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো গাড়ি নাই।।
উত্তর পাড়ার ঐ মোখলেস
লেখা পড়ার নেই কোনো লেশ
তবুও তার আছে ঘোড়া বিএম ডব্লিউ গাড়ি
টাকা আছে কাড়ি কাড়ি
নাই নাই কোনো অভাব যে নাই।।
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখা পড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো পাড়ি নাই
কাঠ ফাটা রোদ্রে ছেঁড়া ছাতা মাথায়
মতি স্যার পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়..।।
পায়ে হেঁটে মতি স্যার হাজার ফুল ফোটায়-
এই সূর্যের সম্মান ফেরৎ চাই ফেরৎ চাই
মোখলেস গাড়ি হেঁকে হুল ফোটায়-
এই বেয়াদপের বিচার চাই বিচার চাই… ।।

বিচারের ধ্বনিতে কম্পমান বাংলাদেশ। বহু টিভি চ্যানেল এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে।
এতো কিছুর পরও মোখলেস সাহেব গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। মাননীয় শিক্ষামণ¿ী একটি তদন্ত কমিটি করে দিয়ে কি সুন্দর বগল বাজাচ্ছেন। আর যে আমলা কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে, তিনি কেমন প্রতিবেন তৈরী করবেন- তা বোঝার কারো বাকী নেই । বিচারের বাণী নিভৃতে আর কতকাল কাঁদবে..?

মতি স্যারের হাতে এখন এক ভরি স্বর্ন। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা। বৃষ্টির জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন তিনি। কিন্তুু বৃষ্টির খবর নেই। এখন কাঠ ফাটা রোদ্র । ছেলেটি বৃষ্টির মাঝে খিচুরি খেতে চেয়েছিলো… খিচুরি আয়োজন করার মতো পর্যাপ্ত টাকা আছে- বৃষ্টি নেই। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন- কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরী করবেন।

একদিন সোনার মেডেলটি দূরের এক বাজারে বিক্রি করে দিলেন। গরুর গোস্ত চাল ডাল কিনলেন। তার সহধর্মিনীর জন্য হুবহু আরেকটি কানের দোল বানালেন । দুইটা টিনও কিনলেন। আর কিনলেন কিছু পলিথিন।
খিচুরি রান্নার আয়োজন শুরু হলো। মতি স্যারের দুই মেয়ে মেয়ের জামাই ও নাতী/নাতনীরা বেড়াতে এলো। কিন্তু রাবেয়া বেগমের আপত্তি- রতন বৃিষ্ট ছাড়া খিচুরি খাইতো না। মতি স্যার বললেন, তোমার রান্ধা তুমি রান্ধো- একটু অপেক্ষা করো দেখবা কেমনে বৃষ্টি আনি…

মতি স্যার দশ/বারোটা পলিথিনে পানি ভরে টিনের চালে উঠলেন। চালের উপর বড়ই গাছের ডালে পানি ভর্তি পলিথিন গুলো বিভিন্ন জায়গায় বাঁধলেন। অদ্ভ’ত এক ছেলে মানুষী খেলা শুরু করেছেন তিনি।

বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে রতন সবার আগে খেতে বসে। আজও তাই করলো। মতি স্যার পানি ভর্তি পলিথিন গুলোকে ফুটো করে দিলেন। রিম ঝিম শব্দে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো… রতন মাটিতে শীতল পাটিতে বসে কি আনন্দ করে খিচুরি খাচ্ছে। মতি স্যার চালের এক ফুটোতে দেখছেন সে দৃশ্য… ঠিক তার বাবার মতো আসন পেতে বসে কত মজা করে রতন খিচুরি খাচ্ছে। আনন্দে মতি স্যারের দু’চোখে ঝরছে বৃষ্টি। কিন্তু মেকআপ করা বৃষ্টির তোড়ে তার চোখের জল ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। চোখের জল কেউ না দেখাটাই ভালো । এটা মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়।

হঠাৎ পা পিচলে চাল থেকে পড়ে যায় মতি স্যার। ঘরের পেছনে বিকট এক শব্দে সবাই ছুটে গিয়ে দেখে, মতি স্যার নিঃশব্দে কাঁতরাচ্ছেন । মাথায় ও বুকে প্রচন্ড আঘাতের কারনে কথা বলতে পারছেন না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে। চিকিৎসকদের ভাষ্য- মাথায় প্রচন্ড আঘাতের কারনে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটেছে। বাঁচার আশা ক্ষীণ। এতোক্ষন আইসিইউতে কড়াকড়ি থাকলেও এখন শিথিল করা হয়েছে । তার একমাত্র ছেলে রতনকে রোগী দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে । রতন মতি স্যারের মাথায় ও গালে হাত বুলাচ্ছে। সন্তানের ষ্পর্শে মতি স্যারের চেতনা কিছুটা ফিরেছে। কিন্তু তা চারদিকে তাক করা কোনো মেশিনে ধরা পড়েনি। তিনি তার ছেলের হাতের ছোঁয়ায় খিচুরির গন্ধ অনূভব করতে পেরেছেন। ছেলেটি হাত ধোয়ার সময় পায়নি। কাজেই ওর হাতে খিচুরির গন্ধটা এখনো লেগে আছে। রতন বার বার তার পিতার ডান পাশের গালে আলতো করে আঙ্গুল ছোঁয়াচ্ছে আর মৃদু সুরে ডাকছে- বাজান বাজান ও বাজান…মতি স্যার তার মায়াভরা ডাক স্পষ্ট শুনতে পারছেন এবং দেখতেও পারছেন তাকে। কিন্তু উত্তর দিতে পারছেন না। অনেক চেষ্টা করছেন কিছু বলার- পারছেন না। বুকে মনে হচ্ছে, বিশাল এক পাথর চাপা দিয়ে রয়েছে। পাথরটা কেউ সরিয়ে দিলেই তিনি কথা বলতে পারতেন। মতি স্যারের বলতে ব্যাকুল ইচ্ছে হচ্ছে- ’ বাবা রতন খুব মন দিয়ে শোনো, আমার গালে যে চড় মেরেছে সে নির্বোধ, বোকা। দেখো, তার এই বোকামীর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে বাংলাদেশ। এখনো নির্বোধটা আমার কাছে ক্ষমা চায়নি। যাক, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। বাবা রতন, তুমি মনে মনে যে প্রতিশোধ নেওয়ার পণ করেছো – তা ভুলে যেও।

ছেলেটির মায়াভরা ছল ছল চোখে তিনি আর তাকাতে পারছেন না। চোখের কর্ণিয়া একটু অন্য দিকে ঘুরালেন। চোখে পড়লো- ডেক্ট্রোজ স্যালাইনের দিকে। উনার কেবলি মনে হচ্ছে- নলের ভিতর দিয়ে কৃত্রিম বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে সরাসরি তার দেহে। তিনি কয়েক ঘন্টা আগে ছেলের বৃষ্টিতে খিচুরি খাওয়ার বায়না মেটাতে পলিথিন দিয়ে এমন বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন তার ভাঙ্গা চালার ঘরে। ছেলের মতো তারও বায়না ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে- ডিম ভাজি দিয়ে খিচুরি খেতে। সাথে থাকবে শুকনা মরিচ ভাজি। সবই আনা হয়েছে। শুকনা মরিচ ভাজির সুন্দর ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছে।
হঠাৎ তিনি আর এখন কিছুই দেখতে পারছেন না- শুকনা মরিচের ঘ্রাণ পাচ্ছেন না। ডেক্সট্রোজ স্যালাইনের ফোটাও থেমে গেছে। চারদিক ঢেকে গেছে অন্ধকারে, এক ভয়াবহ অন্ধকার…
###

রুহুল আমীন রাজু
কটিয়াদী , কিশোরগঞ্জ , বাংলাদেশ ।
মুঠোফোন ঃ ০১৯২ ১২৮০৫৬৫, ০১৭২ ৯৪৮৮০৪৯
ই-মেইল ঃ rohulaminraju@gmail.com