ডিসেম্বর চলে এল মানেই কেকের জন্য প্রতীক্ষা শুরু। করোনা কালে কলকাতার কেক-বাণিজ্যের চেহারা কেমন? খোঁজ নিলেন সুমিত দে ক্যালেন্ডারে যখন দেখা দিয়েছে ডিসেম্বর মাস, তখন মনের মাঝে উঁকি দিতে বাধ্য কেকের হাতছানি। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এক জায়গায় জুড়ে কেকের স্তুপ থাকে এ সময়। ডিসেম্বর মানেই বড়দিন, নতুন বছরের আগমন ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠার ইন্ধন। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরের বড় দিনেও কি অনলাইনে, দোকানের শো-কেসে সে ভাবে শোভা পাবে নানা বাহারি কেক? লকডাউন, করোনা আবহ কি থাবা বসাবে এ বার বড়দিনের কেক-সাম্রাজ্যেও? ‘অবশ্যই। দোলে রং বিক্রি হয়নি, কালীপুজোয় বাজি বিক্রি হয়নি। সেখানে কী ভাবে আশা করব মারাত্মক সংক্রমকের ভয় ভুলে, মানুষ কেক কিনবেন দেদার?’ আসন্ন বড়দিনের কেকের বাজার নিয়ে ফোনেই সন্দিহান অমিতাভ জানা। হাওড়ার প্রায় ৫০ বছরের বেকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাপুজি’-র ডিরেক্টর। অন্যান্য বছরের তুলনায় কি এ বছরের বড়দিনে কেক-দুনিয়ায় তফাত গড়বে করোনা? ‘করোনার কারণ তো রয়েছেই, তা ছাড়াও প্লাম তেলের দাম বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে চিনি-মাখন-ডিম-কাজু-কিশমিশ সমস্ত কিছুর দাম, তাতে কীভাবে যে এ বার প্ল্যানিং করা হবে সেটাই চিন্তার।’ ফোনেই ব্যাখ্যা অমিতাভের। প্রতি বছর বড়দিনে ২০-২২ রকমের কেকের পসার সাজাতে, নভেম্বর থেকেই শুরু হয়ে যায় তাঁদের পরিকল্পনা। এ বছর তাঁরা এখনও শুরু করে উঠতেই পারেননি তাঁদের পরিকল্পনা। যা খুব স্বাভাবিক। ‘গত বছর যেখানে অন্য সমস্যায় ৭০% মাল বানিয়েছিলাম, এ বার তা আরও কমিয়ে ৪০% ভেবে কাজ করব। কারণ বাজার কোথায়?’ অমিতাভের আশঙ্কা। যদিও শঙ্কার মাঝেই আশা দেখছেন ‘মিও আমোরে’-র প্রোডাকশন হেড গৌতম হালদার। এ বারের বাজার নিয়ে গৌতমকে প্রশ্ন করতে, ব্যস্ততার মাঝে তিনি তাঁর মোবাইল এগিয়ে দেন সংস্থার জনৈক কর্মীর কাছে। সেই ফোনেই আশাবাদী শোনায় তাঁর কণ্ঠ। ‘বড়দিনের সময় আমরা প্রায় ১১ রকমের ফ্রুট কেকের প্যাকেজিং করি। এ বারও তার ব্যতিক্রম করছি না। দেখা যাক কী হয়।’ ওয়েস্ট বেঙ্গল বেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যকর্তা আরিফুল ইসলামের কাছে জানা গেল, সারা বাংলায় ছোট-মাঝারি-বড় মিলিয়ে বেকারির সংখ্যা প্রায় ৩০০০। কলকাতায় ৪০০র কাছাকাছি। যার সঙ্গে জড়িত প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের রুজি। ফ্লুরিজ, নাহুম, মিও আমোরে, মনজিনিস, সুগার অ্যান্ড স্পাইস-এর মতো নামী বেকারিরা আশাবাদী কিছুটা হলে, শহর কলকাতার ছোট বেকারি মালিকরা বড় আশঙ্কায়। ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার কলিন স্ট্রিটে ৪৫ বছরের কেকের ব্যবসা, ‘মারুতি কেক’-এর মালিক হাজি শেখ শাহজানের। বড়দিনের মরসুম আসতেই ১৮-২০ জন কারিগরকে নিয়ে নেমে পড়েন কেক তৈরিতে। কিন্তু এ বছর তাঁর কেক-কারবারে ভাঁটার টান। ফোনে শাহজানের হাপিত্যেশ, ‘এমনিতে নভেম্বরের মাঝেই শুরু হয়ে যায় ব্যবসা। কিন্তু এ বছর বাজার নেই। মানুষের হাতে টাকা নেই। সেই সঙ্গে জিনিসের যা দাম বাড়ছে, তাতে ব্যবসা আগে যেখানে শতকরা ১০০ শতাংশ করতাম, এ বার তা কমিয়ে ৩০-৪০ শতাংশ করার কথা ভাবছি।’ শেখ শাহাজানের কথার সুরই যেন ভেসে বেড়ায় রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের সালদানহা পরিবার, বো স্ট্রিটের মন্টু বড়ুয়া, বউবাজারের ওয়েস্টন স্ট্রিটের আজমির, কেকের ছোট ব্যাপারিদের কথায়। বেকারি সংস্থা কর্তা আরিফুলের গলায় উদ্বেগের সুর। তিনি অন্য ব্যাখ্যা দিচ্ছেন বিভিন্ন বেকারি প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি দেখে। ‘আসলে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া থেকে আজ প্লাম তেল আমদানিই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে গত বছর যে তেলের দাম ছিল কিলো প্রতি ৬৫-৭০ টাকা, আজ তা কিনতে হচ্ছে ১১০-১১৫ টাকায়। তার সঙ্গে বেড়েছে চিনি-মাখন-ডিম-কাজু-কিশমিশ সব কিছুর দাম। যা কেক বানাতে লাগে। ফলে বেকারি শিল্প আজ সঙ্কটে। তাঁরা করবেন কী?’ এঁদের সবার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্যান্য বছর বড়দিনের মরসুমে হাওড়া-শিয়ালদহের বাজারে লাটকে লাট মজুত থাকে কেক। ট্রেনযাত্রীদের হাত ঘুরে, স্টেশন-সংলগ্ন দোকান থেকে যে কেক ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে মফসসলের মানুষের ঘরে ঘরে। এ বারের সেই চিত্রটা সম্ভবত অন্য হতে চলেছে। কারণ এ বছর কেকের প্রোডাকশন অনেক কম হবে। তাই প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের হাতে সে ভাবে পৌঁছবে না বড়দিনের কেক। শুধু তাই নয়, অন্যান্য বছর যেমন অনলাইনে শোভা পায় ৪০০-৫০০ ধরনের কেক। কেকের সেই বৈচিত্র্যেও বাধা হয়ে দাঁড়াবে এ বছরের কেকের বাজার। বড়দিনের কেক এ বার বৈচিত্র্যে অনেক কমবে। তা হলে কি এবারের বড়দিনে কারও ক্রিসমাস, কারও সর্বনাশ?এই সময় ডিজিটাল এখন টেলিগ্রামেও। সাবস্ক্রাইব করুন, থাকুন সবসময় আপডেটেড। জাস্ট এখানে ক্লিক করুন-

Source link

Comments

comments